মাধ্যমিকে টাইপিস্ট থেকে অফিসারে পদোন্নতি : শিক্ষকদের পাশ কাটিয়ে শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ
জাকিরুল ইসলাম
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষকরা শিক্ষার মেরুদণ্ড—এই বাক্যটি আমাদের জাতীয় জীবনে এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে বাস্তবতার সঙ্গে এর দূরত্ব এখন চোখে পড়ার মতো। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থান দেখলে মনে হয়, মেরুদণ্ড নয়—তাঁরা যেন ব্যবস্থার সবচেয়ে অবহেলিত অংশ।
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া এক প্রজ্ঞাপনে ৮২ জন দাপ্তরিক কর্মচারী সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। তারা এতদিন ১৪ বা ১৬ গ্রেডে মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী, হিসাব রক্ষকসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এই পদোন্নতির ফলে তারা সরাসরি ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হয়ে মাঠপর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে এসেছেন। বলা হয়েছে, সবকিছুই হয়েছে ২০২১ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী। আইন হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আইনের আড়ালে ন্যায় কোথায় দাড়িয়ে আছে?
একই সময়ে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিকে তাকালে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। নীতিমালায় সাত বছর চাকরির পর ‘সিনিয়র শিক্ষক’ পদে পদোন্নতির কথা থাকলেও বাস্তবে বহু শিক্ষক ১৫ কিংবা ১৬ বছর পার করেও সেই স্বীকৃতি পান না। কেউ কেউ একই গ্রেডে চাকরি শেষ করে অবসরে যান। ২০২১ সালে এক দফায় ৫,৪৫২ জন শিক্ষক পদোন্নতি পেয়েছিলেন। সেটিই যেন নিয়মের ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
আরও বিস্ময়কর হলো, ২০২১ সালের একই বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে—উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মোট পদের ৫০ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। বাস্তবে এই বিধান আজও কাগজের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে, বাস্তবতায় তার কোনো প্রতিফলন নেই। যাঁরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা পড়েন, শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সংকট বোঝেন—তারাই মাঠ প্রশাসনের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
এর বিপরীতে যাদের কর্মজীবন কেটেছে ফাইল, নথি ও হিসাবের টেবিলে, তারাই আজ শিক্ষকদের তদারকির দায়িত্বে আসছেন। কয়েক বছর পর তারাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হবেন। তখন সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও এমপিও ভুক্ত স্কুলের শিক্ষকরা তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করবেন। এই বাস্তবতা শিক্ষকদের কাছে কেবল বৈষম্য নয়, এটি পেশাগত অপমানের এক নীরব ঘোষণা।
প্রশ্ন হলো—শ্রেণিকক্ষ না দেখা অভিজ্ঞতা দিয়ে কি শ্রেণিকক্ষের মান বিচার করা যায়? যারা কখনো পাঠদানের চাপ, শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বা অভিভাবকের প্রত্যাশা সামলাননি, তারা কীভাবে শিক্ষকদের দক্ষতা মূল্যায়ন করবেন? একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক যখন দেখেন, তার চেয়ে কম শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতা সম্পন্ন কেউ কেবল প্রশাসনিক সুবিধার জোরে তার ওপর কর্তৃত্ব করছেন, তখন তার আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষত একক নয়, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই বৈষম্যের পেছনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও আছে। শিক্ষকরা সংখ্যায় বেশি হলেও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। তাদের সংগঠন কার্যকর নয়, নেতৃত্ব নিয়ে অনাস্থা আছে। ফলে তারা অসৎ পথে সুবিধা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন না, বা নামতে পারেন না। অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মচারীরা সংখ্যায় কম হলেও অত্যন্ত সংগঠিত। অফিসকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তাদের ধারণা গভীর। তারা জানেন কোথায় কথা বলতে হয়, কার কাছে যেতে হয়, কোন দরজাটি নীরবে খুলে যায়।
ফলে এক ধরনের অদৃশ্য সমীকরণ তৈরি হয়। যেখানে নীতি, ন্যায্যতা বা শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বড় বিষয় থাকে না। ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত হলেই অনেক সিদ্ধান্ত সহজ হয়ে যায়। নতুন নীতিমালা তৈরি হয়, কাঠামো বদলায়, পদোন্নতির পথ প্রশস্ত হয়—কিন্তু সেখানে শিক্ষার মান বা শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা খুব কমই বিবেচনায় আসে।
শিক্ষা সংস্কার যদি সত্যিই লক্ষ্য হয়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা। একটি স্বচ্ছ, সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত অর্গানোগ্রাম এখন জরুরি। যেখানে শিক্ষকরা নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বাভাবিক নিয়মেই পদোন্নতি পাবেন। উপজেলা, জেলা, আঞ্চলিক অফিস থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রশাসনে অভিজ্ঞ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিধিমালায় থাকা ৫০ শতাংশ কোটা বাস্তবায়ন এখন আর কোনো আবেগী দাবি নয়, এটি ন্যূনতম ন্যায়বিচার।
শিক্ষকদের তদারকি করবেন শিক্ষকই—এটাই স্বাভাবিক। যারা শ্রেণিকক্ষ দেখেনি, তারা শ্রেণিকক্ষের উন্নয়ন করবে—এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
পদোন্নতি বঞ্চিত রেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। এই সত্য যত দেরিতে বোঝা হবে, ক্ষত তত গভীর হবে। নইলে একদিন দেখা যাবে—কেরানিরা বস, শিক্ষকরা তদারকির বস্তু, আর শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল কাগজে সুন্দর।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।