জিবলি প্লাটফর্মে ছবি তৈরি করা বিপজ্জনক!

১৫ এপ্রিল, ২০২৫

সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অ্যানিমেটেড ছবি দেখা যাচ্ছে। অতীত থেকে বর্তমানের বিভিন্ন ছবি মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে অ্যানিমেশন স্টাইল ছবিতে। এর পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ঘিবলি। পুরো বিশ্ব এখন কাঁপছে এই ট্রেন্ডে। যে যেমন পারছেন নিজের জুতসই ছবি জিবলি স্টাইল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। সাধারণ মানুষ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রের তারকারাও মজেছেন এই জিবলিতে। এই ট্রেন্ড সিনেমার দৃশ্য থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ছবি পর্যন্ত সবকিছুকে জিবলি ধাঁচের ভিজ্যুয়াল ছবিতে রূপান্তরিত করছে। অমিতাভ বচ্চন, শচিন টেন্ডুলকার ও নেইমারের মতো তারকারাও এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়েছেন।

ডিজিটাল সেনসেশন তৈরির পাশাপাশি ভাইরাল এই ট্রেন্ড ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গোপনীয়তা লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ও ফাঁস হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে ইতিমধ্যে সতর্কও করেছেন। তারা ব্যবহারকারীদের এআই ইমেজ-জেনারেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে সে সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই ট্রেন্ডে মজার ছলে গা ভাসাতে গিয়ে নিজেদের কোনো বিপদে ফেলতে যাচ্ছেন তা নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জিবলি স্টাইল আসলে কী?

স্টুডিও জিবলি ইনকরপোরেশন হলো জাপানের টোকিওতে অবস্থিত একটি অ্যানিমেনশন স্টুডিও। অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রিতে এই কোম্পানিটির তৈরি করা অ্যানিমেগুলোর বিপুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। সংস্থাটি ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ ও ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হিরো’-র মতো অ্যানিমে তৈরির জন্য বিশ^জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এ ছাড়া কোম্পানিটির অ্যানিমে চরিত্রগুলো মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

ওপেনএআইয়ের ইমেজ জেনারেশন টেকনোলজির লেটেস্ট ভার্সন ব্যবহার করে এই ছবি তৈরি করা হচ্ছে। এটি একটি অ্যানিমেটেড স্থিরচিত্র। চ্যাটবট এআই চ্যাটজিপিটি এমন একটি ফিচার লঞ্চ করেছে, যা বিভিন্ন রকমের ছবিকে জিবলি ইমেজ তৈরি করে দিয়েছে। এই নতুন ফিচার স্টুডিও জিবলি স্টাইল ছবির ছড়াছড়ি। ইউজাররা তাদের পছন্দের ছবিগুলো নতুন ফিচার ব্যবহার করে ঘিবলির জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড ছবির মতো তৈরি করছে।

যেভাবে বানানো হয় জিবলি স্টাইল ছবি

জিবলি ট্রেন্ডের ছবি বানাতে সবচেয়ে বিখ্যাত অ্যাপ এখন চ্যাটজিপিটি। এই অ্যাপটি খুলে নিজের ছবি আপলোড করে দিয়ে লিখতে হয় ‘transform it into ghibli style’। এতেই আপনার ছবিটি ঘিবলি স্টাইলের ছবির মতো দেখতে হয়ে যাবে। চ্যাটজিপিটি ছাড়াও রয়েছে গ্রোক এআই অ্যাপ। একইভাবে এই সাইট খুলে নিজের ছবি আপলোড করতে হয়। লিখতে ওপরের একই কমান্ড। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপটি আপনার ছবির ভোল পাল্টে দেবে জিবলিতে। এ ছাড়াও হাগিং ফেসসহ বেশ কয়েকটি অ্যাপ ব্যবহার করে জিবলি স্টাইলে ছবি বানানো যায়।

যে বিপদে পড়তে পারেন আপনি

জিবলি অ্যাপে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত ছবি কোথায় যাচ্ছে আপনি কি তা ভেবে দেখেছেন? এআই প্ল্যাটফর্মে আপনার এই ছবি সংরক্ষিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বিভিন্নভাবে এটি ব্যবহার হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এখনই এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ আপনি যে ব্যক্তিগত ছবি এআই টুলগুলোতে আপলোড করছেন, সেগুলো শুধু সংরক্ষণই করা হচ্ছে না, বরং এআই মডেল ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। 

জিবলি ট্রেন্ডদের ঝুঁকি নিয়ে এআই কী বলছে?

আমরা চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, জিবলি আর্ট তৈরির জন্য অনলাইনে বহু ছবি আপলোড করা হচ্ছে। এটি কি নিরাপদ? আপলোডকৃত ছবি প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত হচ্ছে কি? এআই নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে, এই ট্রেন্ড নিরাপদ নয় এবং আপনার ব্যক্তিগত ডাটা সংরক্ষিত হচ্ছে।

এআই ইমেজ জেনারেটর ব্যবহার করে ভুয়া প্রমাণ তৈরি করা সহজ। ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করা ব্যবহারকারীরা নিজেদের ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের সম্মতি ছাড়াই ক্ষতিকারক কনটেন্ট এবং ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন তৈরিসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এসব ডেটা ব্যবহার করা হতে পারে।

খারাপ উদ্দেশ্য থাকা যে কেউ এআই ইমেজ জেনারেটর তৈরি করবে। ফলে জাল প্রমাণ তৈরি করা অত্যন্ত সহজ করে তুলবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে এবং প্রায় বিনা খরচে এগুলো তৈরি করতে সক্ষম হবে। তথ্য কেলেঙ্কারির সুযোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে।

ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম ‘প্রোটন’ এআই সিস্টেমে ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করার বিপদগুলো তুলে ধরেছে। একবার একজন ব্যবহারকারী একটি ছবি আপলোড করলে সে এর ভবিষ্যতের ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কারণ এই ছবিগুলো এআই মডেল প্রশিক্ষণ ডেটাসেটে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি বা হয়রানিমূলক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

ব্রিটিশ বিশ্লেষক এলি ফ্যারেল-কিংসলে সতর্ক করেছেন, ব্যক্তিগত ছবি বা চিন্তাভাবনা এআই প্ল্যাটফর্মে আপলোড করলে মেটাডেটা এবং অবস্থানের ডেটাসহ সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ পেতে পারে। এটি বিশেষ করে শিশুদের জন্য উদ্বেগজনক। তারা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে বেশি পড়তে পারে। তিনি আরও সতর্ক করেছেন, যদি কোনো পরিষেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয়, তবে ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ ভবিষ্যৎ না ভেবে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া হলে তাদের মূল্য দিতে হতে পারে। জিবলি স্টাইলের এআই শিল্পের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সৃজনশীলতা এবং মজা অপরিহার্য হলেও ব্যবহারকারীদের নিজেদের গোপনীয়তা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

জিবলি ট্রেন্ডে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?

প্রাইভেসি সেটিংস চেক করুন-নিশ্চিত করুন যে আপনার আপলোড করা ছবি শুধু আপনিই বা নির্দিষ্ট কিছু লোকই দেখতে পারবে। কম সংবেদনশীল ছবি আপলোড করুন-ব্যক্তিগত বা শনাক্তযোগ্য ছবি আপলোড না করাই ভালো। 

প্ল্যাটফর্মের শর্তাবলি পড়ুন-বুঝে নিন, আপনার ছবি কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে। এআই টুলে ছবি সংরক্ষণ না করতে দিন-যদি প্ল্যাটফর্ম ছবিগুলো ডিলিট করার বিকল্প দেয়, তবে তা অবশ্যই ব্যবহার করুন।