সাইকেলেই বদলে গেল আসমার জীবন

২০ জুলাই, ২০২৫

দীর্ঘ ১২ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর একদিন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন আসমা। সঙ্গে ছোট দুই সন্তান। মাথার ওপর ছাদ ছিল না, পাশে ছিল না পরিবারের কেউ। প্রথমে ভাঙারি দোকানে কাজ, তারপর বাসাবাড়ির কাজ। আর আজ, নিজেই একজন উদ্যোক্তা—সাইকেল চালিয়ে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেন নিজের হাতে বানানো হ্যান্ডমেড পণ্য। আসমার গল্প যেন এক সংগ্রামী নারীর দীপ্ত অভিযাত্রা।

২০০৭ সালে গার্মেন্টসে কাজ করতে গিয়ে বিয়ে হয় আসমার। প্রথমে হেলপার, পরে অপারেটর। কিন্তু সংসার জীবন ছিল নির্যাতনে ভরা। রাতে ১২টা পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরেও স্বামীর টর্চার থেকে রেহাই পাননি। অবশেষে একদিন ডিভোর্স নিয়ে বেরিয়ে আসেন নতুন জীবনের খোঁজে। আমি কিছুই পারতাম না। শুধু জানতাম, বাঁচতে হলে কিছু একটা করতে হবে। দুইটা বাচ্চা ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলাইছি, বললেন আসমা।

বাসাবাড়িতে কাজ করতে করতেই আসমার মনে হলো, একটা সাইকেল থাকলে কাজে যাওয়া-আসা সহজ হবে। তখনই একটি পুরোনো সাইকেলের প্রেমে পড়ে যান। দাম চাওয়া হলো ৪ হাজার ৫০০ টাকা। দিতে পারেননি। দুই মাস পর দোকানদার তার জীবনের গল্প শুনে নিজেই বললেন, আপা, আপনি ৩ হাজার ৫০০ দিলেই হবে। 

সেই সাইকেলেই শুরু হলো তার নতুন পথচলা। পড়ে গেছেন বারবার। তবু হাল ছাড়েননি। নিজেই শিখেছেন চালানো। ঢাকার রাস্তায় আজ দাপিয়ে বেড়ান সাইকেল নিয়ে। 

ফেলে দেওয়া বোতল, গাছের ছাল, ঝিনুক, রশি দিয়ে তৈরি করেন ঘর সাজানোর পণ্য। হস্তশিল্পের এসব পণ্য নিজেই তৈরি করেন, বিক্রি করেন ইডেন কলেজের সামনে, অনলাইনেও চলে বিক্রি।

আমি প্রতিদিন ১৭ ঘণ্টা কাজ করি। সকাল বেলা একটা ডিম আর এক কাপ চা খেয়ে বসে পড়ি কাজে। কেউ আমাকে শেখায়নি। ইউটিউব দেখে দেখে নিজেই শিখছি। এখন নিজের প্রোডাক্ট, নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করছি, জানালেন তিনি।

আসমার জীবনের বড় বদল ঘটেছে গত কয়েক বছরে। তিনি বলেন, আমি একসময় ৫০০ টাকা ভাড়ায় বস্তিতে থাকতাম। এখন ১০ হাজার টাকার বাসায় থাকি। আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতাম, এখন নিজের কাজ করি।

সাইকেলের পেছনে সাজিয়ে নেন তার হস্তশিল্পের পণ্য। ইডেন কলেজের কাছে সেগুলো বিক্রি করেন। প্রতিমাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সঙ্গে অনলাইন অর্ডার তো আছেই।

আমি চাই আমার একটা বড় প্রতিষ্ঠান হোক। যেখানে আরও মেয়েরা কাজ করতে পারবে। আমি জানি আমার পেছনে কেউ নেই। বন্ধু, পরিবার, আত্মীয়—কেউ না। আমি একা। কিন্তু আমি থামবো না। ইনশাআল্লাহ, আমার স্বপ্ন পূরণ হবেই।