৩০ জুলাই, ২০২৫
সারাদেশের খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ ও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবিতে পদযাত্রা ও প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে পরিবেশবাদী যুব সংগঠন গ্রীন ভয়েস।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) সকালে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপি প্রদানের জন্য গ্রীন ভয়েসের কর্মীরা পদযাত্রা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে আসলে পুলিশ পদযাত্রা থামিয়ে দেয়।
এরপরে গ্রীন ভয়েসের ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলকে স্মারকলিপি প্রদানের জন্য গাড়িতে করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নিয়ে যান এবং গ্রীন ভয়েস প্রতিনিধি দল প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিবের কাছে স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন এবং তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
পদ যাত্রার আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বাপা'র সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, আজকের দিনে মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষার দাবি শুধুই পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। নাগরিকের সুস্থ জীবনযাপনের পূর্বশর্ত হলো মুক্ত পরিবেশ, খোলামেলা মাঠ ও সবুজ উদ্যান। দুঃখজনকভাবে আমাদের নগরায়নের ধারা এই পরিবেশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পরিকল্পনার নামে, উন্নয়নের নামে জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে ক্ষমতাধরেরা মাঠ ও পার্ক দখল করছে। আমরা চাই, মাঠ-পার্ক রক্ষা শুধু আন্দোলনের বিষয় না হয়ে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হোক। জনগণের চাপ ও তরুণদের সচেতনতার মাধ্যমেই এ দাবিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আজকের এই আয়োজন সেই ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগেরই অংশ।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দেশের মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানগুলোকে যারা দখল ও ধ্বংস করছে, তারা মূলত উন্নয়নের নামে লুটপাটের রাজনীতি করছে। জনগণের স্বার্থ নয়, গোষ্ঠীগত লাভই তাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা দেখতে পাই, প্রতিটি শহরে, প্রতিটি মহল্লায় খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমি আজকের এই সমাবেশ থেকে সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানাই—আপনারা নির্বাচনী ইশতেহারে মাঠ, পার্ক, পরিবেশ ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিন। তরুণরা আজ যে আন্দোলন গড়ে তুলছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাদের পাশে দাঁড়ানোই হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আজকে ছাত্র-যুব সমাজ মাঠ, পার্ক ও উদ্যান রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, জুলাই সনদে এই লড়াইয়ের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে আসুক। সংস্কারের নামে আমরা বহু আলোচনা, সমঝোতা ও সনদের কথা শুনি, কিন্তু সেখানে পরিবেশ, খেলার মাঠ বা পার্কের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয় না। এই তরুণ প্রজন্মই ইতোমধ্যে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে, আর সেই তারুণ্যকে প্রহসনের ফাঁদে ফেলে দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধেই আজকের এই কর্মসূচি। আমরা এই স্মারকলিপিকে বেছে নিয়েছি যেন সবাইকে স্পষ্টভাবে জানানো যায় জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্তিতে পরিবেশ, মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণের বিষয়টি একটি জরুরি ও সম্মিলিত অঙ্গীকার। এই ঐক্য ও সংগ্রাম নিশ্চিত করতেই আমাদের আজকের এই আয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে গ্রীন ভয়েসের প্রধান সমন্বয়ক আলমগীর কবির বলেন, গরিবের সুন্দরী বউ, সবার ভাবি—এই কথার মতোই খেলার মাঠ, পার্ক আর উন্মুক্ত স্থানগুলো এখন সবার চাহিদার বিষয়, কিন্তু রক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউ। স্বাধীনতার এত বছর পর, ছাত্রদের গণ-অভ্যুত্থানের পরও আমাদের আজ মাঠ রক্ষার দাবিতে কথা বলতে হচ্ছে—এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। মাঠ রক্ষার দাবিতে আজ আমাদের কারাগারে যেতে হয়—এটা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। ভূমিদস্যুদের দৃষ্টি এখন সরাসরি মাঠ ও পার্কের দিকে। তাদের চোখে মাঠ মানে ভাগাড়, মলত্যাগের স্থান, ময়লার ভাগাড়, কিংবা উচ্চমূল্যের দালানকোঠার জায়গা। মাঠগুলো এখন যেন দখলের ও ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এখনই কঠিন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পদযাত্রা ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলো হলো—বিদ্যমান এবং সম্ভাব্য খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্তস্থানগুলোর একটি বিশদ স্থানিক নিরীক্ষা (comprehensive spatial audit) পরিচালনা করা এবং তদনুযায়ী তালিকা তৈরী করা; অবৈধভাবে দখলকৃত খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্তস্থান উদ্ধার করা এবং উদ্ধারকৃত জমি বা স্থানগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে যৌথ পরিচালন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; খেলার মাঠ ও পার্ক সুরক্ষা করার পাশাপাশি তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ‘আন্তঃসবুজ সংযোগ’ স্থাপন করা; স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে অব্যবহৃত সরকারি বা ব্যক্তিগত জমি এবং স্কুল-কলেজের মাঠসমূহের বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করা অর্থাৎ অব্যবহৃত এসকল জমিগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা কমিউনিটি পার্টনারশিপ–এর মাধ্যমে শিশুদের জন্য সদ্ব্যবহার করা; স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ অব্যবহৃত সময়কালে অর্থাৎ, ক্লাসের সময়ের পরে বা বন্ধের পর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা।
নির্দিষ্ট সময়ে অব্যবহৃত থাকা স্থানগুলোতে তাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী সময়-নির্ধারিত (Time Stipulated) ভাবে শিশুদের জন্য ব্যবহার করা যা ঐ স্থানের প্রাপ্যতা অনুযায়ী দিনের নির্দিষ্ট সময়ে হতে পারে অথবা দীর্ঘ সময়ব্যাপীও (৫-১০ বছর) হতে পারে; পদচারীবান্ধব সবুজ করিডোর স্থাপনের মাধ্যমে পার্ক, লেক এবং সাংস্কৃতিক উম্মুক্ত স্থানসমূহকে সংযুক্তকরণ; খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানগুলোর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্বচ্ছতা তদারকির জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহে খেলার মাঠ ও পার্ক বিষয়ক পৃথক একটি ইউনিট স্থাপন করা; তেঁতুলতলা মাঠকে স্থায়ীভাবে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণপূর্বক সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নিশ্চয়তা পূর্বক এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ করতে হবে।
গ্রীন ভয়েস এর প্রধান সমন্বয়ক আলমগীর কবিরের সভাপতিত্বে ও গ্রীন ভয়েস এর কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন এর সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন— সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, গ্রীন ভয়েসের উপদেষ্টা সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া, বাংলাদেশ ফুটবল সাপোর্টার্স ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন যুবায়ের, জুরাইন ফুটবল একাডেমীর ক্রীড়া সম্পাদক সোহাগ দেওয়ান, গোলাপবাগ মাঠ রক্ষা আন্দোলন এর সমন্বয়ক হাসনাত জুবায়ের, মিরপুর প্যারিস রোড খেলার মাঠ রক্ষা আন্দোলনের মাসুদ পাখি, গ্রীন ভয়েস এর সহ-সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম রাতুল, আরিফুর রহমান, শাকিল কবির, ফাহমিদা নাজনীন, গ্রীন ভয়েস তেজগাঁও কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার কবির রিদয় প্রমুখ।