ইবিতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আপ্লুত জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্যরা

০৩ আগস্ট, ২০২৫

গতবছরের জুলাই বিপ্লবের শহিদ পরিবারের সদস্যদের সাথে মতবিনিময় ও স্মৃতিচারণ করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) প্রশাসন। রবিবার (৩ আগস্ট) বেলা ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে ছাত্র-শিক্ষক সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

এই অনুষ্ঠানে ১৭টি শহিদ পরিবার ও আন্দোলনে আটক হওয়া ৩১ জন শিক্ষার্থী সম্মাননা দেওয়া হয়। এসময় তারা বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করেন এবং সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লব প্রথম বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। তাছাড়াও অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সহ-সমন্বয়ক, শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া আন্দোলনকারী সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা কর্মচারীরা ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম গ্রেফতারকৃত ইবি শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান (ইইই বিভাগ ২০১৭-১৮) বলেন, ‘আমি ৭১ দেখিনি কিন্তু চব্বিশের জুলাই দেখেছি। যারা আন্দোলনে গিয়ে ফিরে আসেনি এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছে তাদের অবদানের চেয়ে আমি খুব নগণ্য। সেইদিন গ্রেফতার করে মোবাইল কেড়ে নিয়ে হাজতে নিয়ে নেয়। পানি, খাবার দিত না বরং বোতল মাথায় দিয়ে ঘুমাতাম। আমাদের শিক্ষকরা চেষ্টা করে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

শহিদ ইউসুফের মেয়ে শিমা খাতুন বলেন, আমিও ঘরে বসে থাকতে পারিনি, অংশগ্রহণ করেছি। আব্বা যখন গুলি খেয়ে মারা যান, তখন গিয়ে দেখি একসাথে ৩ জন গুলিবিদ্ধ শহিদ দেখে প্রথম বুঝতে পারছিলাম না। আব্বার পা দেখেই বুঝতে পেরেছি ওনি আব্বা। 

শহিদ সবুজের স্ত্রী রেশমা খাতুন বলেন, আমরা স্বামী জীবন দিয়েছে দেশের জন্য, জাতির জন্য সেটা যাতে দেশ মনে রাখে। আমার স্বামীকে হত্যার ঘটনায় মামলা করেছি, ১১ জন গ্রেফতার করেছে, কিন্তু এখনও বিচার করা হয়নি। আমরা কিছু চাই না তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে। সকল শহিদ পরিবারের প্রতি সুনজর রাখবেন। আমি সুবিচার চাই এবং খুনিদেরকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চাই।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইবি শাখা সমন্বয়ক এস এম সুইট বলেন, শহিদদের কথাগুলো শুনলে পরবর্তীতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। আজকের দিনে শিক্ষকরা আমাদের আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছিলেন। বিভাজনের ষড়যন্ত্রে পা না বাড়ানোর জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

ডিনদের পক্ষ থেকে ধর্মতত্ত্ব অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আ.ব.ম সিদ্দিকুর রহমান আশ্রাফী বলেন, ‘শহিদ পরিবারের প্রতি সম্মান রেখে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার জন্য অনুরোধ করছি।’

ইবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিনুর রহমান বলেন, অনেকে এই সরকারকে ফ্যাসিস্ট বলে কিন্তু আমি বলি মাফিয়া সরকার। ৪ তারিখ যখন আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম তখন আমাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার রুজু করেছিল৷ সরকার পতন না হলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে পারা তো দূরের বিষয় বেঁচে থাকাটা অনিশ্চিত ছিল। ৫ আগস্টের আগে আমরা একতাবদ্ধ ছিলাম কিন্তু পরবর্তীতে এসে ফাটল লক্ষ করা যাচ্ছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারাটাই শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।

বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের সভাপতি প্রফেসর ড. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আজকের দিনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অংশগ্রহণ করায় মোট ২৮ জন শিক্ষকদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার রুজু করেছিল। শহিদ পরিবারের প্রতি সুনজর এবং দোসরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক উপাচার্যকে অনুরোধ করছি।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য বলেন, আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটি জুলাই আন্দোলনের শহিদদের জন্য উৎসর্গিত। আমি শহিদদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিস্ট রেজিমকে উৎখাতে যারা জীবন দিয়েছে তাদের প্রতি আমরা চির ঋণী। রক্তের মূল্য কখনো পরিশোধ করা যায় না। রক্তের বিনিময়েই একটা পরিবর্তন আসে। এর জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে জাতিকে জাগ্রত হতে হয়। জুলাই আন্দোলনে সবাই ঐক্যবদ্ধ না হলে ফ্যাসিস্ট রেজিমকে সমূলে উৎপাটিত করা যেত না। আজকের বাংলাদেশ আর পিছনে ফিরে যাবে না। দেশে নতুন  ফ্যাসিস্ট তৈরি হবে না। দেশ গণতন্ত্রহীন হবে না। আমাদেরকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিতে হবে। দেশ পরিবর্তনের জন্য  ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ না হলে ফ্যাসিস্ট আবারো মাথাচাড়া দিবে।

তিনি আরো বলেন, রক্তের মূল্য পরিশোধ একা বা কোন দলের পক্ষে সম্ভব না। সবাই মিলে সুন্দর বাংলাদেশ না গড়লে এর মূল্য শোধ হবে না। জনতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা শহিদদের স্মরণে কিছু স্থাপনার নাম পরিবর্তন করেছি। এছাড়া অন্য স্থাপনাগুলোই যারা আন্দোলনে শহিদ হয়েছেন ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যারা পরিশ্রম করেছেন তাদের নামে নামকরণ করা হবে। সরকারের প্রতি অনুরোধ শহিদের স্মৃতি জাগ্রত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিন। আমরা যেন তাদের ভুলে না যাই।