১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
শ্বশুর ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি নিজেও কুমারখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। শ্বশুরের সুপারিশে ঝিনাইদহের শৈলকুপা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন তিনি। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কলেজটির নতুন নামকরণ করা হয় ভাটই বাজার সরকারি ডিগ্রি কলেজে।
তবে এর আগেই নিয়োগ বাণিজ্য, ব্যাকডেটে নিয়োগ, কলেজের ফান্ড তছরুপ করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। বলছিলাম কলেজটির অধ্যক্ষ আ ক ম মামুনুর রশিদের কথা। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরের একের পর এক লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরেও অদৃশ্য কারণে তা তদন্তের মুখ দেখেনি। এখন আবার ভোল পাল্টে অধ্যক্ষ মামুনুর বিএনপি নেতাকর্মীদের আপনজন হয়ে উঠেছেন।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে দলের ছত্রছায়ায় তিনি শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জিম্মি করে রাখতেন, এত অনিয়মের পরেও ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারতেন না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পোশাক পরিবর্তন করে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নতুন ফন্দি এঁটেছেন তিনি।
জানা যায়, কলেজটি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয়করণ করা হয়। এর পর ব্যাকডেটে নিয়োগের মহোৎসব শুরু হয়ে যায় কলেজটিতে।
একক ক্ষমতাবলে ব্যাকডেটে বিভিন্ন সময়ে ২৯ জনকে নিয়োগ দেখান অধ্যক্ষ মামুনুর। ভুয়া সার্কুলারে মাধ্যমে ২০১৯ সালে মৃত ও অন্যত্র চলে যাওয়া ডিগ্রি শিক্ষকদের পদে ২০১৫ ও ২০১৮ সালে অবৈধভাবে ব্যাকডেটে নিয়োগ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এ ছাড়াও ওই কলেজের অনার্সের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নাসিমা খাতুনের স্বপদ থেকে সরিয়ে তাকে অফিস সহকারীতে নিয়োগ দিয়ে উক্ত পদে হাফিজুর রহমানকে ব্যাকডেটে নিয়োগ দিয়ে ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। শুধু হাফিজুর রহমানই নন অনার্সে এমন অনেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এ ছাড়াও সাবেক সভাপতি আব্দুল হাই এমপির স্বাক্ষর জাল করে অধ্যক্ষ টিউশন ফিসের ১২ লাখ টাকা চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ করেন।
করোনাকালীন সময়ে সরকার থেকে ফেরত এইচএসসি শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র ফির ৪০০ জনের ৪০০ টাকা করে রেখে দিয়ে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি।
সূত্র জানায়, মূল কপির ওপর টেম্পারিং করে সভাপতি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে ২০২৩ সালে ২৯ জনকে অবৈধ নিয়োগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ। ২২ আগস্ট ২০১৬ সালে দৈনিক খবর পত্র পত্রিকার ১৪ জন নিয়োগের সার্কুলারটি জাল করে একই ডেটে সোনালী খবর পত্রিকায় টেম্পারিং করে ১৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১০ আগস্ট ২০১৭ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার নিয়োগের সার্কুলারটি জাল করে একই ডেটে একই পত্রিকা টেম্পারিং করে ১২ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১০ আগস্ট ২০১৭ দৈনিক খবর পত্র পত্রিকার ১২ জন শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলারটি জাল করে একই ডেটে সোনালী খবর পত্রিকা টেম্পারিং করে ৮ জন শিক্ষক ও ৪ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। ১০ জানুয়ারি ২০১৫ দৈনিক সমকাল পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের কোন সার্কুলার না থাকলেও তিনি ওই পত্রিকার টেম্পারিং করে ১১ জন শিক্ষক ও তৃতীয় শ্রেণির ৭ জনকে নিয়োগ দেন। যা মূল পত্রিকার সঙ্গে কোনো মিল নেই। দৈনিক সোনালী খবর পত্রিকার ভুয়া সার্কুলার দেখিয়ে একজন কম্পিউটার অপারেটর ও একজন স্টোরকিপার একজন এমএলএসএস নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যার কোনো সার্কুলারই নেই ওই পত্রিকায়। এভাবে অবৈধ নিয়োগের মাধ্যম অন্তত ৪ কোটি টাকা নিয়োগ বাণিজ্য করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। অন্যায় অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরির্তনের পর তিনি ভোল পাল্টে নিজের অপকর্ম জায়েজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কলেজ অধ্যক্ষ আ ন ম মামুনুর রশীদের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিক বার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ ব্যাপারে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই অধ্যক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে মাউশি থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই তাদের একটি টিম ওই কলেজে তদন্ত করতে আসবে।