০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কথায় কথায় বিরূপ মন্তব্য করার প্রবণতা যেন একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য সেই উন্নাসিক মনমানসিকতারই প্রতিফলন, যেখানে শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অথচ তাদের পরিশ্রম ও বেতনের বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়েছে।
শুনে মনে হয়, প্রাথমিক শিক্ষকরা বুঝি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নিয়েছেন এবং কোনো কাজ না করেই কেবল 'অনেক বেতন' নিচ্ছেন।
'অনেক বেতন' বনাম ১৩তম গ্রেডের বাস্তবতা:
কর্তা ব্যক্তিরা যখন অবলীলায় বলেন, "শিক্ষকরা এখন অনেক বেতন পান", তখন প্রশ্ন জাগে, এই 'অনেক বেতন'-এর মানদণ্ডটা কী?
সত্যিটা হলো, একজন প্রাথমিক শিক্ষক স্নাতক পাস করে নিয়োগ পান ১৩তম গ্রেডে। অথচ তাদের সমযোগ্যতার অন্য পেশাজীবী—অথবা ক্ষেত্রবিশেষে কম যোগ্যতাসম্পন্নরাও—বেতন পান ১০ম গ্রেডে বা তারও উপরে। দেশের অন্যান্য স্তরের শিক্ষকদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা ও পরিশ্রম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা/সাড়ে ৪টা পর্যন্ত), কিন্তু বেতনের দিক দিয়ে তারা সবচেয়ে কম।
যখন নতুন পে-স্কেল হয়, তা সব চাকরিজীবীর জন্যই হয়। কিন্তু এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কথায় মনে হয়, সরকার যেন শুধু প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য আলাদা করে বিশেষ দয়া দেখিয়েছে! আমাদের পাশের দেশ ভারতে প্রাথমিক শিক্ষকরা যে বেতন ও মর্যাদা পান, তার দিকে তাকালে বাংলাদেশের শিক্ষকের ১৩তম গ্রেডের এই 'অনেক বেতন' কতটা হাস্যকর, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। মাননীয় কর্তা ব্যক্তিগণ, একবার নিজেদের বেতনের স্কেলের সঙ্গে এই ১৩তম গ্রেডের বৈষম্যটা মিলিয়ে দেখুন, তারপর কটাক্ষ করুন!
শিক্ষকের দোষ নয়, 'কাঠের মান' ও কাঠামোগত দুর্বলতা:
প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে অভিযোগ করার আগে, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উচিত বাস্তবতাটা বোঝা।
১. শিক্ষার্থীর উৎস: সচ্ছল এবং সচেতন পরিবারগুলো এখন তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করায় না। সাধারণত আর্থিক সামর্থ্যহীন, শিক্ষণ-পরিবেশের অভাব এবং অসচেতন পরিবারের সন্তানরাই এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসে। মিস্ত্রি যতই ভালো হোক, যদি 'কাঠের মান' ভালো না হয়, তবে উন্নত মানের ফার্নিচার আশা করা যায় না। শিক্ষকদের দোষ নয়, সমস্যা হলো—'ভালো কাঠ' বা সচেতন শিক্ষার্থী আর সরকারি স্কুলে আসছে না।
২. বাণিজ্যিক ফাঁদ: কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো প্লে-নার্সারিতে ৬-৭টি বই চাপিয়ে এবং বিসিএসের সাধারণ জ্ঞান পড়িয়ে 'চমৎকার' ফলাফল দেখিয়ে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে। এটা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হলেও, সামর্থ্যবান অভিভাবকরা সেই বাণিজ্যিক ফাঁদেই পা দিচ্ছেন। মনোবিজ্ঞানসম্মত কারিকুলাম অনুসরণ করেও শিক্ষকদের গালমন্দ শুনতে হচ্ছে।
৩. কর্মঘণ্টা: দীর্ঘ কর্মঘণ্টার (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা/সাড়ে ৪টা) কারণে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে খেলার ও পড়ার সুযোগ পায় না—এই অজুহাতেও সচেতন অভিভাবকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর দায় কেন শিক্ষকদের ওপর?
উন্নাসিকদের প্রতি বিনীত ব্যঙ্গ:
শিক্ষকদের সামান্য কোনো ত্রুটি ঘটলেই 'উন্নাসিক' কর্মকর্তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কড়া মন্তব্য। কিন্তু তারা নিজেরা হয়তো ভুলে যান, শিক্ষকদের এই পরিশ্রমেই তৈরি হচ্ছে সেইসব প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতে দেশের কর্ণধার হবে।
প্রিয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ সকল উচ্চপদস্থ কর্তা ব্যক্তিগণ, দয়া করে শিক্ষকদের ছোট করার আগে বা তাঁদের 'অনেক বেতন' পাওয়ার খোটা দেওয়ার আগে, এই বাস্তবতাগুলো খতিয়ে দেখুন:
"আপনারা যাঁদের তুচ্ছ করছেন, সেই ১৩তম গ্রেডের শিক্ষকরাই দেশের প্রান্তিকতম শিক্ষার্থীদের মানুষ করার জন্য প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করছেন। আপনারা আপনাদের সন্তানদের যে পরিবেশে পড়াচ্ছেন, সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত এই শিক্ষকরা। শিক্ষকদের সম্মানহানি করে নয়, বরং শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডের বৈষম্য দূর করে এবং প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ঠিক করেই শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব।"
কথায় কথায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার বন্ধ হোক। আপনাদের উন্নাসিকতা শিক্ষকদের মনোবল ভাঙছে। আপনাদের উচিত, শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি দেওয়া, কারণ এই শিক্ষকরাই দেশের ভবিষ্যৎ গড়ছেন।
লেখক: শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল ।