১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
আমাকে প্রায়ই প্রশ্ন করা হয়, শিল্প কি আমাদের ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি সব সময় অনুভব করি, বিষয়টি কেবল ইতিহাসের নয়; বিষয়টি মানুষের ভেতরের অনুভব, দেখার চোখ এবং উপলব্ধির জায়গা নিয়ে। আমরা যারা বড়, আমাদের মনে অজান্তেই নানা রকম হতাশা জমে থাকে। ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ, রাজনীতি, সময়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে। কিন্তু যখন এমন কোনো আয়োজনের মধ্যে প্রবেশ করি, যেখানে হাজার হাজার শিশু তাদের কল্পনা ও স্বপ্ন কাগজে তুলে ধরছে, তখন সেই জমে থাকা হতাশাগুলো যেন একটু একটু করে হালকা হয়ে আসে।
শিশুরা স্বচ্ছ মনের। তাদের মনে যে ভাবনা আসে, তারা সেটাকে কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই কাগজে তুলে ধরে। তারা চাইলে আকাশকে বেগুনি আঁকতে পারে, সূর্যকে নীল বানাতে পারে, মানুষকে ডানা লাগিয়ে দিতে পারে। অথচ আমরা যারা বড়, তারাই তখন তাড়াতাড়ি বলে বসি—না, আকাশ বেগুনি হতে পারে না।
এখানেই আসলে পার্থক্যটা। বড়রা নিয়ম বানায়, সীমা টানে, সংজ্ঞা নির্ধারণ করে; আর শিশুরা সেই সীমার বাইরে গিয়ে ভাবতে পারে। এই স্বাধীনতাই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো বলেছিলেন, প্রতিটি শিশুই একজন চিত্রশিল্পী।
প্রতিটি শিশু শিল্পী হয়ে জন্মায়, কিন্তু সবাই শেষ পর্যন্ত শিল্পী থাকে না। কেন থাকে না? কারণ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভেতরে ‘ঠিক’ আর ‘ভুল’-এর সমীকরণ ঢুকে পড়ে। আমরা বিচার করতে শুরু করি, তুলনা করতে শুরু করি। ধীরে ধীরে সেই সরলতা নষ্ট হয়। আর এই সরলতা মানে শিশুসুলভ অজ্ঞতা নয়, সরলতা মানে শিল্পবোধ।
সেই শিল্পবোধটাই আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরা বড়দের কাছ থেকে শিখবে। কিন্তু এই ধরনের আয়োজনগুলোতে এসে আমার বারবার মনে হয়েছে, উল্টোটা ঘটার সুযোগও আছে। বড়দেরই শেখার আছে শিশুদের কাছ থেকে। তাদের দেখার ভঙ্গি, তাদের সাহস, তাদের নির্ভীক কল্পনা—এসব আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে, শিল্পের মূল কাজ হলো প্রশ্ন তোলা, নতুনভাবে দেখা।
এই প্রতিযোগিতার বিষয় ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান। দুটি গভীর, রক্তক্ষয়ী এবং জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, শিশুদের ওপর কোনো বিষয় চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু এখানে এসে যখন আমি তাদের আঁকা ছবিগুলো দেখলাম, তখন বুঝলাম, বড়দের দেখা আর ছোটদের দেখার মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। আর সেই পার্থক্যটা আবিষ্কার করাই আমাদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
আমরা মুক্তিযুদ্ধকে দেখি অভিজ্ঞতার আলোকে, বইয়ের আলোকে, রাজনৈতিক ব্যাখ্যার আলোকে; আর শিশুরা দেখে অনুভবের আলোকে। আমরা গণ-অভ্যুত্থানকে বিশ্লেষণ করি যুক্তি দিয়ে; তারা দেখে আবেগ দিয়ে। কিন্তু সেই আবেগটাই সবচেয়ে সৎ। কারণ শিশুরা বিচার করে না, তারা অনুভব করে। আর অনুভবই শিল্পের মূল শক্তি।
এই আয়োজনের আরেকটি দিক আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে শিশুরা এসেছে, তাদের সঙ্গে এসেছে তাদের মা-বাবা। এই দিনটায় শিশুরা যে কত রকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছে, কতটা আনন্দ, কতটা উত্তেজনা; এই বয়সে সেটা কল্পনা করা আমার পক্ষেও কঠিন। আমি এটাকে শুধু একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি না; আমি এটাকে দেখি একটি স্মৃতি তৈরির দিন হিসেবে।
এই বিশাল আয়োজনের পেছনে বসুন্ধরা গ্রুপের যারা কাজ করেছে, আমি অন্তত তাদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই। এমন একটি আয়োজন করা সহজ নয়। পাঁচ হাজারের বেশি শিশু, তাদের সঙ্গে অভিভাবকদের এক জায়গায় আনা, এটা অসম্ভবের কাছাকাছি। কিন্তু এখানে অসম্ভবটাই সম্ভব করে দেখানো হয়েছে। এ জন্য বসুন্ধরা গ্রুপ এবং বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজকে সাধুবাদ জানাই।
আজকের শিশুরা কিন্তু আর্ট স্পটে যায় না। তারা সংগ্রাম দেখেনি সরাসরি; তারা দেখেছে মিডিয়ার মাধ্যমে, টেলিভিশনে, মোবাইলে, শহরের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতে। এই দেখা থেকেই তাদের মস্তিষ্ক কাজ করছে, তাদের কল্পনা তৈরি হচ্ছে। আমি বলব, এই যে শিশুরা এত অল্প বয়সেই সচেতন হচ্ছে, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে শিশুটি তিন বছরের, কয়েক দিনের মধ্যেই সে ১৫ বা ১৮ বছরের তরুণ হয়ে যাবে। আর এই দিনের স্মৃতিগুলো তার ভেতরে থেকে যাবে। কী সুন্দর স্মৃতি, যা তাকে সারা জীবন প্রভাবিত করবে।
ছবি আঁকাটা ভালো লাগত বলেই আমি আর্ট কলেজে পড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রথম যে শিক্ষাটা পেয়েছিলাম, সেটাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমাকে শেখানো হয়েছিল, আমরা যে সবুজ দেখি, সেটা শুধু এক ধরনের সবুজ নয়। সবুজের ভেতরেও বহু রকমের সবুজ আছে। সাধারণ মানুষ একটি গাছকে গাছ হিসেবে দেখে। কিন্তু শিল্পীকে শেখানো হয় গাছটিকে ভিন্নভাবে দেখতে। এই দেখার ভঙ্গিটাই শিল্পশিক্ষার মূল। শিল্পীর জীবন সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে আলাদা। কারণ শিল্পী প্রকৃতি, মানুষ আর জীবনকে ভিন্ন চোখে দেখে। সেই ভিন্ন দেখার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।
আমি দীর্ঘদিন ধরে শিল্পচর্চার কথা বলি। কারণ শিল্প মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। আপনি যদি সুন্দরের চর্চা করেন, আপনার ভেতরের সৌন্দর্যবোধ প্রখর হবে। আর আপনি যদি অসুন্দরের চর্চা করেন, তাহলে অসৌন্দর্যবোধটাই শক্তিশালী হবে।
যদি মানুষের ভেতরে শিল্পবোধ থাকে, সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ থাকে, তাহলে সে পৃথিবীকে উপভোগ করতে চাইবে। জীবন তখন অন্ধের মতো হাতড়ানো হবে না। পৃথিবী অনেক বড় একটি জায়গা। আমি তার ভেতরে একজন ক্ষুদ্র মানুষ। আমার মন পূর্ণ করার জন্য এখানে অসংখ্য কিছু আছে; কিন্তু দুঃখের বিষয়, এক জীবনে অধিকাংশ মানুষ সেই সৌন্দর্যগুলো না দেখেই চলে যায়।
যে শিশুরা এখানে ছবি এঁকেছে, প্রত্যেক অভিভাবকের কাছে আমার আবেদন, এই ছবিগুলো যেন ফেলে না দেন। এগুলো ঘরে রেখে দিন। কারণ এগুলো কেবল কাগজে আঁকা ছবি নয়; এগুলো আপনার সন্তানের চিন্তা, অনুভব আর এই দিনের স্মৃতি। একদিন বড় হয়ে সে যখন নিজের ছোটবেলার এই ছবিগুলো দেখবে, তখন হয়তো সে নিজেকেই নতুন করে চিনবে। শিল্প আমাদের সেই চিনে নেওয়ার চোখটাই ফিরিয়ে দেয়।
লিখেছেন : জুরিবোর্ড সদস্য এবং নাট্য নির্দেশক, অভিনেতা ও চিত্রশিল্পী