৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
ক্ষুধা, পিপাসা, অপুষ্টি, দারিদ্র্য আর অন্ধকার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা এখন যেন অনেকটাই জীবন্মৃত। কিন্তু যারা এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন, তারাও শান্তিতে চির ঘুমটুকু ঘুমাতে পারছেন না। হামাসের আটক করা বিভিন্ন বন্দির লাশ খুঁজতে গাজার কবরস্থানগুলো এখন এলোমেলো করছে ইসরায়েলি সেনারা। কখনও বা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কবর। আর বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশীর শেষ চিহ্নটুকুও এভাবে অবমাননায় মুছে যেতে দেখে শুধু অশ্রু মুছছে নিরুপায় গাজাবাসী। গত বৃহস্পতিবার আলজাজিরায় প্রকাশিত এক খবরে গাজার বাসিন্দা ফাতিমা আবদুল্লাহ নামে তেমনই এক নারীর বয়ান তুলে ধরা হয়। তিন সন্তানের মা ফাতিমা জানান, ইসরায়েলি সেনারা যখন ওই কবরস্থানে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছিল, আমরা সবাই আতঙ্কে ছিলাম। সেখানে আরও হাজার হাজার পরিবারের স্বজনদের কবর অবস্থিত। সবাই ভয় পাচ্ছিল, এরপর হয়তো তাদের প্রিয়জনের কবরটির ওপর আঘাত আসবে। আমি কল্পনা করছিলাম, যান্ত্রিক দানবগুলো আমার স্বামীর কবরের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি মনে মনে বলছিলাম, না খোদা, এমনটা যেন না হয়।
গাজায় লাশগুলো রেহাই পাচ্ছে না এবং শোক পালন এবং মর্যাদা রক্ষার শেষ অধিকারটুকুও কীভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা বর্ণনা করেন ফাতিমা। ইসরায়েলি সেনাদের ওই অভিযানের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, লাশগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, হাড়গোড় আর ব্যাগ যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা হয়েছিল। তারা বুলডোজার দিয়ে কবর গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল এবং অবশেষগুলো এমনভাবে ফেলছিল, যেন সেগুলোর কোনো মূল্যই নেই।
রাফাহ ক্রসিং নিয়ে মিসর-ইসরায়েল তীব্র বিরোধ: গাজার রাফাহ সীমান্ত পারাপার আগামী রোববার থেকে আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে এই ক্রসিং দিয়ে ফিলিস্তিনিদের যাতায়াতের সংখ্যা ও প্রক্রিয়া কী হবে– তা নিয়ে মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গাজায় একের পর এক কবরস্থান ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনিদের লাশের অবমাননা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও ইসরাইলি বাহিনীর এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি উত্তর গাজার একটি ফিলিস্তিন কবরস্থান থেকে রণ গিভিলি নামক এক ইসরাইলি জিম্মির লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে ‘অসাধারণ সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরাইলি টেলিভিশনগুলোতে দেখা গেছে, সেই কবরস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে ইসরাইলি সেনারা হিব্রু গান গেয়ে উল্লাস করছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো এই অভিযানকে ইসরাইলের জন্য ‘জাতীয় নিরাময়ের মুহূর্ত’ হিসেবে প্রচার করলেও, গাজার মাটিতে এই অপারেশন ফিলিস্তিনের পরিবারগুলোর জন্য বয়ে এনেছে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও আতঙ্ক। এই তথাকথিত উদ্ধার অভিযানের সময় ইসরাইলি বাহিনী কবরস্থানের কাছে চারজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং শত শত ফিলিস্তিনি কবর বুলডোজার দিয়ে তছনছ করেছে। এর ফলে অসংখ্য পরিবারকে তাদের প্রিয়জনদের ছিন্নভিন্ন দেহাংশ নতুন করে খুঁজে বের করে পুনরায় দাফন করতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কবরস্থান রক্ষা এবং লাশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হলেও, গাজায় ইসরাইলের এই কর্মকা-কে জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং একটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ‘সম্মিলিত শাস্তি’, যার মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুতেও ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া। ইসরাইলি পক্ষ থেকে প্রায়ই দাবি করা হয় যে হামাস সামরিক উদ্দেশ্যে কবরস্থান ব্যবহার করছে। তবে সিএনএন-এর প্রতিবেদন এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গাজায় অন্তত ১৬টি ফিলিস্তিন কবরস্থান ধ্বংস করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুরো কবরস্থান গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের সামরিক অবস্থান তৈরি করেছে। শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনের মুসলিম ও খ্রিস্টানদের কবরস্থানে নিয়মিতভাবে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে এটি কেবল সামরিক প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।
লাশের ওপর ইসরাইলের এই নিষ্ঠুরতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন গত বছর গাজায় শত শত ফিলিস্তিনির লাশ ফেরত পাঠানো হয়। এসব লাশের অনেকগুলোতে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল এবং কিছু দেহ এতটাই বিকৃত ছিল যে সেগুলোকে শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে অনেক ফিলিস্তিনির মরদেহ ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে, যা তারা ‘দর কষাকষির মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০১৯ সালে ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মরদেহগুলো আটকে রাখার বৈধতাও দিয়েছে।
ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক আমাল আবু সাইফ এ পরিস্থিতির ট্র্যাজেডি তুলে ধরে বলেছেন যে, মৃত ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই অমানবিক আচরণের খবর বিশ্ব মিডিয়ায় খুব সামান্যই জায়গা পায়। যেখানে ইসরাইলি বন্দিদের দাফনের প্রতিটি মুহূর্ত বিশ্বজুড়ে আবেগঘনভাবে প্রচার করা হয়, সেখানে ফিলিস্তিনিদের বিধ্বস্ত কবর এবং ছড়িয়ে থাকা হাড়গোড় নিয়ে বিশ্বের নিরবতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত এই পবিত্র স্থানগুলোর অবমাননা ফিলিস্তিনিদের স্মৃতি মুছে ফেলা এবং শোকাতুর পরিবারগুলোকে চূড়ান্তভাবে অপমান করার একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়েছে।