অন্ধত্বের পথে নীরব ধাপ: গ্লকোমা সম্পর্কে যা জানা জরুরি

১২ মার্চ, ২০২৬

আজ (১২ মার্চ ) বিশ্ব গ্লকোমা দিবস

চোখ আমাদের অমূল্য সম্পদ, কিন্তু কিছু রোগ কোনো জানান না দিয়েই আমাদের এই দেখার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর এক রোগের নাম গ্লকোমা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘দৃষ্টির নীরব চোর’ কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগী বুঝতেই পারেন না কখন তার দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক এই রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু তথ্য।

গ্লকোমা আসলে কী?
গ্লকোমা মূলত চোখের এক জটিল অবস্থা যেখানে চোখের ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে অপটিক নার্ভ বা অক্ষিস্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অপটিক নার্ভই চোখ থেকে দৃশ্যপট মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। যখন এই স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন মস্তিষ্কে সংকেত পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ অন্ধ হয়ে পড়ে।

আমাদের চোখের ভেতর অ্যাকুয়াস হিউমার নামক এক ধরণের তরল নিয়মিত তৈরি হয় এবং চোখের নির্দিষ্ট ড্রেনেজ চ্যানেল দিয়ে বেরিয়ে যায়।

যদি কোনো কারণে এই তরল বের হতে না পারে, তখন চোখের ভেতর চাপ বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাপই অপটিক নার্ভের ওপর প্রভাব ফেলে।

কেন একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?
গ্লকোমার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রায় অদৃশ্য। অন্যান্য রোগের মতো এতে শুরুতে কোনো তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি থাকে না।

রোগী পাশের দৃশ্য ঝাপসা হতে হতে একসময় শুধু সামনের টানেলের মতো অংশ দেখতে শুরু করেন। ততক্ষণে চোখের প্রায় ৪০ শতাংশ স্নায়ু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একবার এই স্নায়ু নষ্ট হয়ে গেলে তা আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

গ্লকোমার প্রধান ধরণসমূহ
গ্লকোমা প্রধানত দুই ধরণের হয়ে থাকে:
১। ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লকোমা: এটি সবচেয়ে সাধারণ।

এতে চোখের চাপ ধীরে ধীরে বাড়ে এবং কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে।
২। অ্যাঙ্গেল-ক্লোজার গ্লকোমা: এটি হঠাৎ করে হয়। এতে চোখে তীব্র ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি ভাব ও ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন?
যদিও গ্লকোমা যে কারো হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে:
বয়স: যাদের বয়স ৪০ বছরের বেশি।
বংশগতি: পরিবারে (বাবা-মা বা ভাই-বোন) কারো গ্লকোমা থাকার ইতিহাস থাকলে।
অন্যান্য রোগ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘদিনের মাইগ্রেন সমস্যা থাকলে।
চশমার পাওয়ার: যাদের চোখের পাওয়ার খুব বেশি (অত্যধিক মাইনাস বা প্লাস লেন্স)।
ওষুধের ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ সময় স্টেরয়েড জাতীয় আই ড্রপ ব্যবহার করলে।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায়
গ্লকোমা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব।
নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা: ৪০ বছরের পর বছরে অন্তত একবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে চোখের প্রেশার এবং অপটিক নার্ভ পরীক্ষা করা জরুরি। এটিই গ্লকোমা থেকে বাঁচার একমাত্র কার্যকরী উপায়।
উপসর্গ অবহেলা না করা: আলোর চারপাশে রংধনু দেখা, ঘনঘন চশমার পাওয়ার পরিবর্তন হওয়া বা হালকা মাথাব্যথাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না।
নিয়মিত ড্রপ ব্যবহার: গ্লকোমা ধরা পড়লে চিকিৎসক নির্দিষ্ট আই ড্রপ দেন। এটি নিয়মিত ব্যবহার করলে চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং স্নায়ু রক্ষা পায়।
অপারেশন বা লেজার: ক্ষেত্রবিশেষে ড্রেনেজ সিস্টেম ঠিক করতে লেজার ট্রিটমেন্ট বা ছোট অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

মনে রাখবেন, অন্ধত্বের এই নীরব ধাপ রুখে দিতে সময়মতো চোখ পরীক্ষাই একমাত্র পথ।

লেখক : ডা. মো: আরমান হোসেন রনি
কনসালটেন্ট
দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবাহানবাগ, ঢাকা।