জুলাইযোদ্ধা নাম ভাঙিয়ে এইসব!

১৮ মার্চ, ২০২৬

জুলাইযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে প্রবল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলে খুব অল্প সময়েই দেশে অপশাসনের পতন ঘটিয়েছেন; রাজনৈতিক পটপরিবর্তন করেছেন। তাঁদের এই তুমুল আন্দোলনের ফাঁকেই এক শ্রেণির সুবিধাবাদী মানুষ জুলাইযোদ্ধার মুখোশ পরে চালিয়ে গেছে নজিরবিহীন অপকর্ম। এ রকমই একজনের খোঁজ মিলেছে রাজশাহীতে। তাঁর দুষ্কর্মের অনুসন্ধান করতে নেমে কালের কণ্ঠ এমন সব তথ্য পেয়েছে, যা জেনে পাঠকমাত্রই চমকে উঠবেন।

 

জুলাইযোদ্ধা নামধারী এই ব্যক্তির নাম গোলাম রাব্বানী। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তাঁকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। এসংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

 

তখন থেকেই নিজেকে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখিয়ে চলেছেন এই সাংবাদিক। তবে অনুসন্ধান বলছে, আরো আগে থেকেই সাংবাদিকতার প্রভাব খাটিয়ে এই গোলাম রাব্বানী নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছেন। এর মধ্যে আছে—সরকারের অর্পিত সম্পত্তি কৌশলে নিজের নামে দলিল করে নেওয়া; একই প্রক্রিয়ায় আরো সরকারি জমি দখলে নেওয়ার তৎপরতা; জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কৌশলে ক্যামব্র্রিয়ান স্কুলকে ভাড়া নিয়ে দেওয়াসহ নিজ কর্মস্থলের নারী সাংবাদিকদের যৌন হয়রানি, নির্যাতন পর্যন্ত।

 

রাব্বানীর কেনা ২৪ বিঘা জমি অর্পিত সম্পত্তি? : গোলাম রাব্বানী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেন, রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুটি মৌজায় দুই কোটি ৭৪ লাখ আট হাজার ৭০০ টাকায় দুটি দলিলমূলে ৮.৩০ একর (২৪ বিঘার ওপরে) জমি তিনি ২০২৩ সালে কিনেছেন।

 

একটি দলিলের নম্বর ২২৭৩; সম্পাদনের তারিখ ১৫/০৫/২০২৩; মৌজা সাদিপুর; জমির পরিমাণ পাঁচ একর ১৫ শতাংশ। আরেকটি দলিলের নম্বর ২২৭৫; মৌজা মুণ্ডুমালা; সম্পাদনের তারিখ ১৫/০৫/২০২৩; পরিমাণ তিন একর ১৫ শতাংশ।

 

ওই এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই পরিমাণ জমির মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। গোলাম রাব্বানী এই জমি দেবাশীষ রায় নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিনেছেন বলে দাবি করেছেন।

কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই জমি সরকারের ‘খ’ তফসিলভুক্ত, অর্থাৎ অর্পিত বা শত্রু সম্পত্তি।

 

জমিতে বসবাসকারী বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে ভূমি অফিসের এমন নথি পাওয়া গেছে; যেখানে দেখা যাচ্ছে—বাসিন্দারা বার্ষিক লিজের টাকা জমা দিয়েছেন। এভাবে বহু বছর ধরেই তাঁরা সরকারের কাছ থেকে ওই অর্পিত সম্পত্তি লিজ নিয়ে ভোগদখল করে আসছেন। পরবর্তী সময়ে গোলাম রাব্বানী কৌশলে প্রথমে জমিটি দেবাশীষ রায়ের মালিকানায় দেন; পরে তাঁর কাছ থেকে কেনা দেখিয়ে নিজের নামে দলিল করে নেন।

 

এই অভিযোগের সত্যতা মেলে তানোরের সাদিপুরে ওই জমিতে বসবাসকারী মানুষের কাছ থেকে। এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে ১৩ শতক জমিতে বসবাস করছি। প্রতিবছর সরকারের কাছে চেক কেটে আমরা এই জমিতে ভূমিহীন হিসেবে বসবাস করি। আমাদের তিন ভাইয়ের তিনটি বাড়ি আছে এখানে। কিছুদিন আগে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী ও তাঁর লোকজন এসে বলেন—এই জমি তাঁরা কিনে নিয়েছেন। কিভাবে কিনে নিয়েছেন জানতে চাইলে তাঁরা কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি। কিন্তু আমাদের বাড়ি ভেঙে  বাড়ি ভেঙে উচ্ছেদ করা হবে বলে হুমকি দিয়ে গেছেন। আমরা এত দিন ধরে এনিমি সম্পত্তিতে বসবাস করছি। কেউ কখনো বলল না এই জমি আমাদের। এখন গোলাম রাব্বানী বলেন তিনি নাকি কিনে নিয়েছেন।’

ভুট্টু নামের আরেক বসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য খুব চেষ্টা করছে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী। আমরা এখন কোথায় যাব? এই সম্পত্তি তো বিক্রি হওয়ার কথা নয়। ওরা ভুয়া কাগজ তৈরি করে ভূমি অফিস থেকে নামজারি করেছে হয়তো। আপনারা খোঁজ নেন। আমাদের পাশে দাঁড়ান।’

পৌনে তিন কোটিরও বেশি টাকা দিয়ে ২৪ বিঘা জমি কেনার কথা স্বীকার করেন গোলাম রাব্বানী। এত টাকা কোথায় কিভাবে পেলেন, জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। জয়পুরহাটে আমার বাবার বাড়ি পাঁচ বিঘা জমির ওপর। এ ছাড়া আমি ১৭টি প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্সি করি। টেলিভিশন চ্যানেলের চাকরি থেকে বছরে আমার তিন লাখ টাকার ওপরে আয় হয়। ওই সব আয় দিয়ে আমি জমিগুলো কিনেছি।’ ওই জমি অর্পিত সম্পত্তি নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

আরো জমি হাতানোর চেষ্টা : রাজশাহীর তানোর ভূমি অফিসের একটি সূত্র জানায়, এ উপজেলার ৯টি মৌজায় ৩০ বিঘা অর্পিত সম্পত্তি নামজারি ও অর্পিত সম্পত্তি কেটে ব্যক্তি সম্পত্তি করার জন্য রাজশাহী নগরীর সাগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা দেবাশীষ রায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কাছে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে দেবাশীষ রায়ের স্বাক্ষর দেওয়া থাকলেও সেখানে যে মোবাইল ফোন নম্বর দেওয়া হয়, সেটি সাংবাদিক গোলাম রাব্বানীর। তবে ওই নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দেবাশীষ রায় আর গোলাম রাব্বানীর কাছে আগের বছরেই ২৪ বিঘা জমির বিক্রেতা দেবাশীষ রায় একই ব্যক্তি।

দেবাশীষের ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘আরএস খতিয়ান মূলে ওই জমির রেকর্ড বিভূতি ভূষণ রায় চৌধুরী, অহি ভূষণ রায় চৌধুরী ও সুখদা সুন্দরী দেবী নামে প্রকাশিত। ওয়ারিশ সূত্রে আমি আবেদনকারী শ্রী দেবাশীষ রায় সংযুক্ত তফসিল বর্ণিত সম্পত্তির অংশীদার। বিভূতি ভূষণ রায় ও সুখদা সুন্দরী দেবী নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে ওয়ারিশ সূত্রে একমাত্র অহি ভূষণ রায় ষোলো আনা সম্পত্তির মালিক হন। এরপর অহি ভূষণ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র কন্যা ঝর্ণা রায় ওই সম্পত্তির মালিক হন। এরপর ঝর্ণা রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র সন্তান হিসেবে আমি দেবাশীষ রায় ওই জমির মালিক হই। কিন্তু আমি সংখ্যালঘু হওয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল আমাকে ভূমি উন্নয়ন কর, অর্পিত সম্পত্তি কর্তনপূর্বক নতুন হোল্ডিং চালু ও নামজারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে দেয়নি।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভাগীয় কমিশনারের টেবিল থেকে দ্রুতগতিতে দেবাশীষের আবেদনের ওই ফাইল রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তর হয়ে চলে যায় তানোর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশতুরা আমিনার কাছে। এরপর তিনি দেবাশীষ রায়কে তাঁর নামে নামজারি করার জন্য গত বছরের ২০ এপ্রিল নোটিশ জারি করেন। তবে শুনানি শেষে বিষয়টির সত্যতা না পেয়ে মাশতুরা আমিনা দেবাশীষ রায়ের পক্ষে নামজারি এবং খাজনা দেওয়ার রায় দেননি।

অনুসন্ধান বলছে, এরপর গোলাম রাব্বানী রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার মধ্যেমে মাশতুরা আমিনাকে বদলি করান। তাঁর স্থলে যোগদান করেন শীব শঙ্কর বশাক। তবে এখন পর্যন্ত ওই জমিটি দেবাশীষ রায়কে দেওয়া হয়নি। 

এই জমি সম্পর্কে জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমার মোবাইল ফোন নম্বর কেউ ব্যবহার করতে পারে। ওই জমি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’ তবে রাব্বানী এও বলেন, ‘জমিটি পেলে আমার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আমাকে কিছু অংশ দিতে হবে দেবাশীষ রায়কে।’

এই অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য তানোর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শীব শঙ্কর বশাককে গতকাল বারবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাইমা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এই ধরনের আবেদনের বিষয় আমার জানা নাই। এতগুলো সম্পত্তি একজন ব্যক্তি কিভাবে পর্যায়ক্রমে এসে এককভাবে মালিক হলো, সেটি দেখার বিষয় আছে।’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কৌশলে ক্যামব্রিয়ান স্কুলকে ভাড়া : রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) সূত্র জানায়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় করে নগরীর তালাইমারী এলাকায় নির্মাণ করা হয় বঙ্গবন্ধু স্কয়ার নামের একটি বিশালাকার তিনতলা ভবন। 

২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরে ভবনটিকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর করার ঘোষণা দেয় আরডিএ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কিছুদিন পরেই রহস্যজনক কারণে ভবনটি ক্যামব্রিয়ান স্কুলকে ভাড়া দেয় আরডিএ। অথচ এই ক্যামব্রিয়ান স্কুলের প্রকৃত মালিক বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান লায়ন খায়রুল বাশার প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় জেলহাজতে রয়েছেন। জানা গেছে, রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের ক্যামব্রিয়ান স্কুলের ফ্রাঞ্চাইজি কিনে নিয়েছেন রাজশাহীর দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক নামে এক ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানীর ঘনিষ্ঠতার কথা অনেকেরই জানা।

আরডিএ সূত্র জানায়, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর করা ওই ভবনটি ভাড়া দেওয়ার জন্য গত বছরের ৭ জুলাই টেন্ডার আহবান করে আরডিএ। ওই টেন্ডারে অংশ নেন সেই দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক, সাইফুর রহমান ও সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী। কিন্তু শুধু দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক ছাড়া বাকি দুজন দরপত্রের সঙ্গে জামানতের টাকা দেননি। মাত্র একজন বৈধ দরদাতা থাকায় ওই দরপত্রটি বাতিল করার কথা। কিন্তু গত বছরের ১১ আগস্ট আরডিএর কমিটি দরপত্র মূল্যায়নের পর সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী ও সাইফুরের দরপত্র দুটি বাতিল করে দেবাশীষ কুমার প্রমাণিকের দরপত্র বৈধ ঘোষণা করে তাঁকে ভবনটি ভাড়া দেয়। দরপত্র মূল্যায়নের পরদিনই ১২ আগস্ট দেবাশীষ কুমার প্রামাণিকের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি সম্পাদনের অনুমোদন দেন আরডিএর চেয়ারম্যান এস এম তুহিনুর আলম। ২৯টি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাসহ বিভিন্ন ফ্লোরের ২৭ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া দেওয়া হয় নামমাত্র মূল্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরডিএর চেয়ারম্যান এস এম তুহিনুর আলমের বাড়িও জয়পুরহাটে। সেই সুবাদে গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে বেশ সখ্য এই চেয়ারম্যানের। আর এই চারজন যোগসাজশ ও কৌশল করেই সুবিধার বিনিময়ে ভবনটি ক্যামব্রিয়ানের হাতে তুলে দিয়েছেন—এই অভিযোগ আছে জোরালোভাবে। বক্তব্য জানতে আরডিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

তবে আরডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আব্দুল্লাহ আল তারিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনেক বড় এই ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। এ কারণে কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে টেন্ডারে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

জানতে চাইলে আরডিএ কমপ্লেক্সের ভাড়াগ্রহীতা দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে আমরা ভবনটি ভাড়া পেয়েছি। এর পেছনে গোলাম রাব্বানীর কোনো হাত নেই। যদিও তিনি বিভিন্ন জায়গায় বলার চেষ্টা করছেন, এই দরপত্রে তাঁর নাকি হাত ছিল। আদৌ আমাদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।’

যৌন হয়রানির দুই অভিযোগ : গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন জুলাইযোদ্ধা এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য রাজশাহী কলেজের এক ছাত্রী। গত ৩ আগস্ট নগরীর চন্দ্রিমা থানায় গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে একটি লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া অ্যাডভাইজার ও জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও একটি টেলিভিশনের সাংবাদিক গোলাম রাব্বানীর স্কাই বাংলা নেট অনলাইন নিউজ পোর্টালে বাদী সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। সেই সুবাদে বাদীর সঙ্গে পরিচয় ছিল গোলাম রাব্বানীর। ওই নিউজ পোর্টালে কাজ করার সময় বাদীকে গত বছরের ৪ জুলাই দুপুরে গোলাম রাব্বানী বিভিন্ন কাগজপত্র নিয়ে ডেকে নেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাদীকে একা পেয়ে গোলাম রাব্বানী বাদীর শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। এক পর্যায়ে বাদী ওই অফিস থেকে বের হয়ে চলে যান। এরপর স্কাই বাংলা নিউজ পোর্টালের কাজ ছেড়ে দেন বাদী।

পরবর্তী সময়ে এই ঘটনার বিষয়ে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে যৌন হয়রানির শিকার ওই তরুণী লিখিত অভিযোগ করেন। এরপর গোলাম রাব্বানী ক্ষিপ্ত হয়ে নানাভাবে আরো হয়রানি করতে থাকেন। বাধ্য হয়ে গত ৩ মার্চ নগরীর চন্দ্রিমা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন ওই তরুণী। পরে সেটি মামলা হিসেবে গৃহীত হয়।

জানতে চাইলে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি খাদেমুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গোলাম রাব্বানী নিজেকে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে ৫ আগস্টের পরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছেন শুনেছি।’

বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ এসব অভিযোগ দেওয়া হয়েছে ইউজিসির চেয়ারম্যান পর্যন্ত। কিন্তু এখনো সেই রাব্বানী বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি খাদেমুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পাওয়ার পরের দিনই গোলাম রাব্বানীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না। তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।’

রাজশাহী নগরীর চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এক নারী সাংবাদিককে যৌন হয়রানির অভিযোগে আরেক সাংবাদিক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত করে যা পাওয়া যাবে, সেইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আসামি জামিনে আছেন।’

আরেক নারী সাংবাদিক নগরীর বোয়ালিয়া থানায় গত ১৪ মার্চ আরেকটি লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, তাঁকে গত বছরের ২৪ জুন গোলাম রাব্বানী স্কাই বাংলা অফিসে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানি করেন।

জানতে চাইলে বোয়ালিয়া থানার ওসি রবিউল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জানি এরকম অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু কার কাছে অভিযোগ আছে, বলতে পারছি না। আজকে রাতে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি তদন্তের ব্যবস্থা করব।’

তবে যৌন হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে রাব্বানী দাবি করেছেন, ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা মব সৃষ্টি করে ওই মিথ্যা মামলাটি করিয়েছেন তাঁর নামে। তিনি ছয় সপ্তাহের জামিনে রয়েছেন। উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন নিয়েছেন।

জুলাইযোদ্ধা পরিচয়ে রাব্বানীর দাপট : নিজেকে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকেই নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে (রাসিক) হামলা-লুটপাটেও ছিলেন তিনি। একাধিক ভিডিও ফুটেজে ওই সময় রাব্বানীকে সিটি করপোরেশনের মেয়রের দপ্তরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে বলে রাসিকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেছেন। তৎকালীন রাসিক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের দপ্তর থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করে গোলাম রাব্বানী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবেন বলে সে সময় আন্দোলনকারীদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওই টাকা তিনি আর জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলে বৈষম্যবিরোধী নেতারাই অভিযোগ করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের একজন মেসকাত হোসেন মিশুর সঙ্গে আরেক ছাত্রনেতার এ বিষয়ে কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে।

যোগাযোগ করা হলে রাজশাহীর তৎকালীন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন অজ্ঞাত স্থান থেকে বলেন, ‘করপোরেশনের ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা আমার আরেক দপ্তরে ছিল। সেটা লুট হয়েছে; তবে কে বা কারা করেছে, তা আমি জানতে পারিনি।’

প্রশ্ন করলে অভিযুক্ত গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘এই ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। ওই দিন আমি রাসিক ভবন রক্ষায় সামনে থেকে কাজ করেছি। কোনো টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয়।’

দুদকে রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ : এদিকে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে কয়েকজন নামধারী জুলাইযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে গোলাম রাব্বানীর মামলাবাণিজ্য, সিটি করপোরেশন থেকে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ, স্কাই বাংলা নিউজ পোর্টালে কাজ করানোর নামে নারী সাংবাদিকদের যৌন হয়রানি, বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকে।

গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর নগরীর বোয়ালিয়া থানায় জুলাইযোদ্ধা কৌশিক ইসলাম অপূর্ব রাজশাহীর শতাধিক বিত্তবান ব্যক্তির নামে একটি মামলা করেন। ওই মামলার পেছনে গোলাম রাব্বানীর ইন্ধন ছিল। এই মামলা দায়েরের পর থেকে গোলাম রাব্বানী এজাহার থেকে নাম প্রত্যাহার করে দেওয়ার নামে বিভিন্ন আসামির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন—এই ধরনের কথোপকথনের অডিও ক্লিপও দুদকে দেওয়া হয়েছে; সেটি কালের কণ্ঠেরও সংগ্রহে রয়েছে।

জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। আপনার বিরুদ্ধে কেউ মনগড়া অভিযোগ তুলতেই পারে, কিন্তু সেগুলোর ভিত্তি আছে কি না, খোঁজ নিয়ে তো দেখতে হবে।’