দিনাজপুরে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা

২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বিজলি, কিরণমালা, দুমকি, সিডর, দুর্বার, রানি, সুইটি আরও বাহারি নামের ঘোড়া ! ঘোড়াগুলোর ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধিমত্তায়, দুলকি চলনে বিদ্যুৎগতি এমন নানামুখী গুণের কারণে তাদের নাম রাখা হয়েছে। পছন্দের ঘোড়াকে পেতে ক্রেতাদের মধ্যেও চলে রীতিমতো কাড়াকাড়ি আর দর-কষাকষি। 

এখন ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা। দরদাম ঠিকঠাকের পর খেলার মাঠে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্রেতাকে দেখানো হয় ঘোড়ার দৌড়। তারপর বেচাকেনার লেনদেন।
  
এ অবস্থা দিনাজপুরের ফুলবাড়ী শহর থেকে ৮/৯ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং বারাইহাট থেকে ৫/৬ কিমি দক্ষিণে আলাদীপুর ইউনিয়নে ২০০ বছর ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন মেলায়। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে লালন করতে প্রতিবছর বাংলা বৈশাখ মাসের ৯/১০ তারিখ থেকে শুরু হয় মাসব্যাপী এই মেলা। স্থানীয়ভাবে গরু, মহিষ ও ছাগল তেমন বেচাকেনা না হলেও ঘোড়াই বেশি বেচাকেনা হয়।তাই এ মেলা বুড়া চিন্তামন ঘোড়ার মেলা নামে দেশব্যাপী পরিচিত। মেলা এক মাস হলেও পশুর মেলা হয় ৭দিন। ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল বেচাকেনা হয় এ মেলায়। তবে এখন গরু-মহিষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মূলত ঘোড়ার মেলা হিসেবে বেশি নাম-ডাক। এছাড়াও মেলায় বসেছে গ্রামীণ মেলাসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান। মেলাকে কেন্দ্র করে হরেকরকম দোকানপাট বসেছে। মেলায় বিনোদনের জন্য দোলনাসহ নাগর দোলা বসেছে। মেলা শুরুর আগেই এখানে ঘোড়া বেচাকেনার জন্য চলে আসে। 
জানা যায়, প্রতি বাংলা বছরের ৯-১০বৈশাখ থেকে ফুলবাড়ীর আলাদিপুর ইউপির মেলাবাড়ী মাঠে এই ঐতিহ্যবাহী বুড়া চিন্তামন ঘোড়ার মেলা ১৩ বৈশাখ ঘোড়াসহ গবাদিপশু বেচাকেনার জন্য মেলার ছাপা (রশিদ) বের হয়। 
আয়োজকেরা বলছেন, এই মেলার জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে ৮ একর জমি-মাঠ। এখানে মাদ্রাসা-স্কুলের প্রশস্ত মাঠে যেমন হাট বসে তেমনি হাসিল অফিস, ডাকঘর, সমবায় অফিস, ক্লিনিক, খেলার মাঠ, ইউপি অফিস-এসবের কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে পরিণত হয়েছে। 

রংপুর তারাগঞ্জ থেকে মজনু মিয়া পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে মেলায় এসেছেন। পাঁচ বছর ধরে মেলায় আসেন। তাঁর বড় ঘোড়াটির নাম ‘নিউপাওয়ার টেন’। দাম হেঁকেছেন সাত লাখ টাকা। সাড়ে পাঁচ লাখ পেলে ছেড়ে দেবেন।
বগুড়া থেকে আজাদ হোসেন ‘সম্রাট’ নামের পাঁচ বছর বয়সের লাল ঘোড়া নিয়ে এসেছেন। দাম হেঁকেছেন তিন লাখ। এটি রেসিং ঘোড়া। দ্রæত দৌড়াতে পারে । ঘোড়াটির যত্ন তিনি নিজেই নেন। ৪০ বছর ধরে এ মেলায় আসেন বলে জানালেন।
গাইবান্ধা থেকে আসা ছমেজ উদ্দীন জানান, তিনি ২৫ বছর ধরে ঘোড়া নিয়ে আসেন এই মেলায়। এবার তিনি চারটি ঘোড়া এনেছেন, সবগুলো বিক্রি করবেন। ঘোড়সওয়ারি কামরুজ্জামান জানান, আগেও তাঁদের বাপ-দাদারা এ মেলায় ঘোড়া কেনা বেচা করতেন, পূর্বপুরুষের সূত্রধরে তাঁরাও আগলে রেখেছেন সেই পারিবারিক ঐতিহ্য। 

মেলার ইজারাদার সফিকুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা সুষ্ঠুভাবে হওয়া এবং বিদ্যুৎ, পানির সুব্যবস্থা রাখতে ২০০ স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন। মেলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে কেনা বেচার রসিদ মূল্য গতবারের মতোই সহনীয় রাখা হবে।
স্থানীয় ৭৯ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সাবেক আলাদীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. দছিম উদ্দীন মন্ডল জানান, এ মেলায় লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুগাঁও, বগুড়া, দিনাজপুর, পাবনা, জয়পুরহাট, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘোড়ার আমদানি হয়।
ফুলবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা কমিটির সভাপতি শিক্ষক আফতাব উদ্দিন জানান, পুরোনো এ মেলা শুরু থেকেই ঘোড়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উন্নতজাতের ঘোড়া আসত। বর্তমানে সেসব এখন স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড় সওয়ারি ও ঘোড়া মালিকেরা এ মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন।

ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. লতিব শাহ বলেন, ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলার নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ রয়েছে।