১০ মে, ২০২৬
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বারবার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের হুমকি। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাত।এই দুই বাস্তবতার মুখে সামরিক শক্তিতে আমূল পরিবর্তন আনছে কানাডা। দীর্ঘ কয়েক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে সর্বোচ্চ নিয়োগের রেকর্ড গড়েছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি প্রতিরক্ষা বাজেটে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছেন। সেনাদের বেতনও বাড়ানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে দেশটি।
সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মাত্র দুই বছর আগে কানাডার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিল ব্লেয়ার সতর্ক করেছিলেন।
তিনি বলেন, বাহিনীগুলো একটি ‘মৃত্যুচক্রের’ মধ্যে আটকে আছে। তবে সেই অবস্থা থেকে বের হওয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী পুনর্জাগরণ দেখা যাচ্ছে। গত এপ্রিলের শেষের দিকে সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত অর্থবছরে তারা সাত হাজারের বেশি নতুন সদস্য নিয়োগ দিয়েছে। যা গত তিন দশকে সর্বোচ্চ।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ‘ট্রাম্প প্রভাব’
বিশেষজ্ঞরা সামরিক বাহিনীতে এই জোয়ার আসার পেছনে বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র সংঘাত ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি। তিনি কানাডাকে ‘৫১তম রাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করায় বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের ফেলো শার্লট ডুভাল-লান্তোইন বলেন, ‘মানুষ যখন দেখে পৃথিবী আর নিরাপদ নয় এবং দেশ ঝুঁকির মুখে, তখনই তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। সাম্প্রতিক এই নিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে একটি ট্রাম্প প্রভাব থাকতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সরকারি উদ্যোগ
তবে কেবল দেশপ্রেম নয়, দেশের বেকারত্বের হারও তরুণদের সামরিক পেশার দিকে আকৃষ্ট করেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সামরিক কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। যা চাকরির নিরাপত্তা ও আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করেছে। গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কার্নি সামরিক বাহিনীকে তার সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন।
প্রতিরক্ষা বাজেটে ঐতিহাসিক মাইলফলক
কানাডা ১৯৮০-এর দশকের পর প্রথমবারের মতো প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয়ের ন্যাটোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। গত মার্চে দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, এই ব্যয়ের পরিমাণ বছরে ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে অটোয়া।
তবে কানাডার এই বাজেট কেবল বেতন বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নতুন ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কিনছে দেশটি। বিদ্যমান ঘাঁটিগুলোর আধুনিকায়ন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করছে। যার মাধ্যমে অটোয়া তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাচ্ছে। ন্যাটোর প্রতি দায়বদ্ধতা পূরণ এবং উত্তর গোলার্ধে নিজেদের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করতেই এই ব্যাপক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
যা বলছেন কর্মকর্তারা
কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ট্র্যাভিস হেইনস বলেছেন, সামরিক বাহিনী আমলাতান্ত্রিক বাধা কমানোর ফলেই নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য সম্প্রতি তারা আবেদনের কিছু অংশ ডিজিটালাইজড করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেটি হলো শুধু নিজ দেশের নাগরিকদের পরিবর্তে কানাডার যারা স্থায়ী বাসিন্দা তারাও আবেদন করতে পারছেন। এতে দেখা গেছে, গত বছরের নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই ছিলেন বিদেশী। কানাডা মোট ৮৫ হাজার ৫০০ জন নিয়মিত সেনা এবং তিন লাখ পর্যন্ত রিজার্ভ সেনা রাখার পরিকল্পনা করেছে।
রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের ফার্স্ট অফিসার অ্যালডেন ক্যাম্পবেলের ভাষায়, ‘আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। উন্নত বেতন ও আধুনিক সরঞ্জামের নিশ্চয়তা সামরিক বাহিনীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কর্মজীবন চলাকালীনই এই উন্নয়নের সুফলগুলো বাস্তবে দেখার অপেক্ষায় আছি।