১২ মে, ২০২৬
রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা চালানোর অভিযোগ তুলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গত ৯ থেকে ১১ মে তিন দিনের যুদ্ধবিরতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর হয়নি বলে দাবি করেছে দেশ দুটি। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দীর্ঘ চার বছরের যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক চেষ্টাগুলো।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতির মধ্যেই রাশিয়ার ড্রোন হামলায় তাদের ৩ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমলেও ফ্রন্টলাইন বা যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনারা আক্রমণ থামায়নি। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনের ৫৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং হামলার ‘যথাযথ জবাব’ দিচ্ছে।
লড়াই চললেও এই বিরতির একটি বড় অংশ ছিল বন্দি বিনিময়। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে, চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১,০০০ যুদ্ধবন্দির বিনিময়ের বিষয়টি নিশ্চিত করবে। তবে রণাঙ্গনে ২১০টিরও বেশি সংঘর্ষের ঘটনায় এই প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পূর্ব ইউক্রেনের দখল এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে বিরোধ কাটছেই না। রাশিয়ার দাবি, শান্তি আলোচনা শুরুর আগেই ইউক্রেনকে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে। ক্রেমলিন বলছে, শান্তি এখনো অনেক দূরে, যদিও পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যুদ্ধ শেষের দিকে।
সংকট কাটাতে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার শিগগিরই মস্কো সফর করতে পারেন। এর আগে ইউক্রেনের আলোচক রুস্তেম উমেরভের সঙ্গেও তারা মায়ামিতে দেখা করেছেন। তবে জার্মানি রাশিয়ার একটি শান্তি প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।
এদিকে, রাশিয়া তাদের সামরিক শক্তির বহরে যুক্ত করতে যাচ্ছে এক ভয়ংকর মারণাস্ত্র। সম্প্রতি রাশিয়ার শিপইয়ার্ড থেকে ‘খাবারভস্ক’ নামক একটি বিশেষ পারমাণবিক সাবমেরিন উন্মোচন করা হয়েছে। এটি মূলত পুতিনের বহুল আলোচিত ‘অজেয়’ অস্ত্র ‘পসেইডন’ পারমাণবিক টর্পেডো বহন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ সমুদ্রের তলদেশে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্যাটেলাইট চিত্র ও উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খাবারভস্ক সাবমেরিনটি প্রায় ১৩৫ মিটার লম্বা। এটি রাশিয়ার বোরি-ক্লাস ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর প্রধান কাজ হলো শত্রুদেশের উপকূলীয় শহর এবং কৌশলগত অবকাঠামোতে পারমাণবিক আঘাত হানা। সাবমেরিনটি অত্যন্ত নিভৃতে চলাচল করতে সক্ষম, যা একে মার্কিন রাডার ও সোনার সিস্টেমের নজর থেকে আড়ালে রাখবে।
এই সাবমেরিনের প্রধান অস্ত্র হলো ‘পসেইডন’ টর্পেডো। এটি সাধারণ কোনো টর্পেডো নয় বরং এটি একটি ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লিচালিত ড্রোন। এর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৭০ নট বা ১৩০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। পারমাণবিক শক্তিচালিত হওয়ায় এর পাল্লা কার্যত সীমাহীন এবং এটি সমুদ্রের তলদেশে ১ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত যেতে পারে, যেখানে বর্তমানের অনেক সাবমেরিন পৌঁছাতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া তাদের উত্তর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের জন্য মোট ৩০টি পসেইডন টর্পেডো এবং ৪টি বিশেষ সাবমেরিন তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। রাশিয়ার ‘পেরিমিটার’ বা ‘ডেড হ্যান্ড’ ব্যবস্থার সাথে এই অস্ত্র যুক্ত হলে এটি এক বিধ্বংসী ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক’ মারণাস্ত্রে পরিণত হবে। অর্থাৎ, রাশিয়ার কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়ে গেলেও এই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন উপকূলীয় শহরগুলোতে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।
রাশিয়ার এই অভাবনীয় অগ্রগতি মার্কিন নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় ধরনের ঘাটতি সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২ সালে তাদের ‘সাবরক’ অ্যান্টি-সাবমেরিন মিসাইল অবসর দিয়েছিল। বর্তমানে রাশিয়ার এই গভীর সমুদ্রে চলাচলের সক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক টর্পেডোকে আটকানোর মতো কোনো দূরপাল্লার স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্র মার্কিন বহরে নেই। যা পেন্টাগনের জন্য চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাল্টা জবাব হিসেবেই রাশিয়া এই পসেইডন প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করেছে। রাশিয়ার ভয় হলো, মার্কিন প্রযুক্তির কারণে তাদের প্রচলিত মিসাইলগুলো অকেজো হয়ে যেতে পারে। তাই সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নীরবে আঘাত করার এই কৌশল বেছে নিয়েছে মস্কো। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই টর্পেডোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে। সূত্র: এশিয়া টাইমস, সিএনএ, রয়টার্স