২২ মে, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বর্তমান সময়ে আর্থিক ও অন্যান্য জরুরি পরামর্শ পাওয়ার কাজকে অনেক সহজ করে তুলেছে। বাজেট তৈরি, ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা কিংবা বিনিয়োগের ধারণার জন্য আজকাল অনেকেই চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো চ্যাটবটের শরণাপন্ন হচ্ছেন। সাধারণ তথ্যের জন্য এটি বেশ উপকারী হলেও অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার জন্য মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তথ্য দিয়ে দিচ্ছে।
এআই চ্যাটবট ব্যবহার করার সময় ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য শেয়ার করা বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। সামান্য একটি ভুলের কারণে হ্যাকার বা প্রতারকদের হাতে ডেটা চলে গিয়ে যেকোনো দিন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্যনীতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব চ্যাটবট তাদের এআই মডেলকে আরও উন্নত বা প্রশিক্ষিত করার জন্য ব্যবহারকারীদের চ্যাট ডেটা নিজেদের সার্ভারে সংরক্ষণ করে। তাই অ্যাকাউন্ট ও টাকা নিরাপদ রাখতে এআই চ্যাটবটকে কোন ৫টি তথ্য দেওয়া যাবে না, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ব্যক্তিগত ও পরিচয় শনাক্তকরণ তথ্য
চ্যাটজিপিটি কিংবা জেমিনি ব্যবহারের সময় ভুলেও আপনার নাম, স্থায়ী বা অস্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য ইনপুট করবেন না। চ্যাটবটে লগ ইন করার জন্য ইউজার নেম বা ইমেইলের প্রয়োজন হলেও মূল চ্যাটের ভেতর এই বিবরণগুলো সম্পূর্ণ দূরে রাখা উচিত। আপনার পরিচয় প্রকাশ পায় এমন যেকোনো ডেটা এআই প্ল্যাটফর্মে থেকে যাওয়া মানেই তা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
২. কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ
আপনি কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন, আপনার পদবি কী কিংবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কাঠামো কেমন, তা কখনোই এআইকে জানানো ঠিক নয়। সাইবার প্রতারকদের কাছে আপনার কর্মসংস্থানের বিবরণটি ডিজিটাল জালিয়াতির একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। প্রতারকেরা যদি জানতে পারে আপনি কোথায় কাজ করেন, তবে সেই বিশ্বস্ত সূত্র ব্যবহার করে আপনার নামে ভুয়া ক্রেডিট কার্ড বা ঋণের আবেদন করা সহজ হয়ে যায়। এমনকি প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে আপনাকে ফাঁদে ফেলার জন্য বিপজ্জনক ইমেইল বা লিংকও পাঠাতে পারে।
৩. নির্দিষ্ট ঋণের হিসাব ও পরিমাণ
একটি চ্যাটবট থেকে আর্থিক বা ঋণ সংক্রান্ত কোনো পরামর্শ নেওয়ার সময় নির্দিষ্ট পাওনাদার বা ব্যাংকের নাম এবং সেখানে আপনার বকেয়া টাকার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করবেন না। উদাহরণস্বরূপ, ‘আমি অমুক ব্যাংক থেকে এত টাকা লোন নিয়েছি, এখন কর ফেরতের টাকা দিয়ে কীভাবে তা শোধ করব?’ এভাবে প্রশ্ন করা একদমই নিরাপদ নয়। কোনো কারণে ডেটা ফাঁসের ঘটনায় আপনার এই চ্যাট হিস্ট্রি হ্যাকারদের হাতে পৌঁছালে, তারা নির্দিষ্ট ওই ব্যাংকের প্রতিনিধি সেজে ফোন করে আপনাকে বড় ধরনের আর্থিক ধোঁকা দিতে পারে। ঋণ সংক্রান্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে সবসময় কাল্পনিক বা পূর্ণ সংখ্যা ব্যবহার করুন।
৪. সুনির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র
অনেকেই নিজের মাসিক বা বার্ষিক বাজেট তৈরি করতে কিংবা বিনিয়োগের পোর্টফোলিও বিশ্লেষণ করতে আয়কর রিটার্নের ফাইল বা ব্যাংক স্টেটমেন্টের ছবি বা ফাইল চ্যাটবটে আপলোড করে দেন। অনেকেই ভাবেন, ফাইলের ওপর থেকে নাম ও অ্যাকাউন্ট নম্বর কালো কালি দিয়ে মুছে দিলে বোধহয় এটি নিরাপদ হয়ে যায়। কিন্তু একটি ট্যাক্স রিটার্ন বা লেনদেনের নথিতে এমন অনেক সূক্ষ্ম ডেটা থাকে যা থেকে আপনার পরিচয় খুব সহজেই বের করে ফেলা সম্ভব। বাস্তব জীবনে অপরিচিত কোনো মানুষের হাতে আপনি যেভাবে নিজের ব্যাংক স্টেটমেন্ট তুলে দেবেন না, ঠিক একইভাবে এআই-এর কাছেও তা দেওয়া যাবে না।
৫. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও পাসওয়ার্ডের তথ্য
ঋণ কীভাবে শোধ করবেন বা পেনশনের টাকা কীভাবে জমালে ভালো হবে, তা বাতলে দেওয়ার জন্য কোনো এআই চ্যাটবটের আপনার মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের পিন এবং পাসওয়ার্ড জানার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি এআই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যত কম তথ্য শেয়ার করবেন, আপনার কষ্টের টাকা ও ব্যক্তিগত জীবন তত বেশি নিরাপদ থাকবে।
সুরক্ষিত থাকার উপায়
যেকোনো এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় সবসময় তার প্রাইভেসি সেটিংস বা গোপনীয়তা নীতি পরীক্ষা করে দেখুন। সেখানে গিয়ে আপনার চ্যাট বা কথোপকথন যাতে এআই মডেলের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত না হয়, সেই অপশনটি বন্ধ বা অফ করে দিন। অনলাইনের অন্যান্য মাধ্যমের মতোই এআই চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অন্ধভাবে সবকিছু বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকুন এবং চ্যাট বক্সকে সবসময় সাধারণ রাখুন।