ক্যানসারের নতুন ইনজেকশনে রোগীদের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূলের দাবি বিজ্ঞানীদের

০১ জুন, ২০২৬

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এমন একটি ইনজেকশনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে আশাব্যঞ্জক ফল পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের দাবি, ত্রিমুখী কার্যক্ষমতাসম্পন্ন নতুন এ ইনজেকশন অনেক রোগীর শরীরে টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট করেছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্মূলও করেছে।

১১টি দেশে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ নামের এই ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া রোগীদের ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা চিকিৎসার পর আবার ফিরে এসেছিল। প্রচলিত চিকিৎসায় যাঁদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না, তাদের ওপরই এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রায়ালে অংশ নেওয়া রোগীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের টিউমারের আকার ছোট হয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
গবেষণার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যানসারবিষয়ক সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’-এর বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীর ওপর এ পরীক্ষা চালানো হয়। ফলাফলে দেখা যায়, ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়েছে অথবা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়েছে এবং ১৫ জনের ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফুসফুসের ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও একই ধরনের ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির তৈরি অ্যামিভান্টাম্যাব বর্তমানে প্রায় ৬০টি পৃথক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পরীক্ষা করা হচ্ছে। মলদ্বার, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের ওপরও এর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।

যেভাবে কাজ করে ইনজেকশনটি

বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যামিভান্টাম্যাব তিনটি উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে— এটি প্রথমে ইজিএফআর (এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। এমইটি নামের একটি জৈবিক পথও বন্ধ করে দেয়, যা অনেক ক্যানসার কোষ চিকিৎসা এড়িয়ে যেতে ব্যবহার করে। পাশাপাশি এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।

এই চিকিৎসা থেকে উপকার পাওয়া রোগীদের একজন ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। তার জিহ্বার ক্যানসার ধরা পড়ে ২০২৪ সালে। পরে তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে পরিচালিত ‘ওরিগএএমআই-ফোর’ ট্রায়ালে অংশ নেন।

কার্ল বলেন, প্রথমে আমাকে কেমোথেরাপি ও রোগপ্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো কার্যকর হয়নি। পরে নতুন এই ট্রায়ালে যুক্ত হই। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার ফল নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।

তিনি জানান, চিকিৎসা শুরুর পর ফোলা ও ব্যথা অনেক কমে গেছে। আগে কথা বলা ও খাবার খাওয়া কঠিন ছিল, কিন্তু এখন তিনি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন।

গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এই ইনজেকশনকে ক্যানসারের নিশ্চিত বা সর্বজনীন চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনো আসেনি। আরও বিস্তৃত গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিশ্লেষণের পরই এর প্রকৃত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।