০৭ জুন, ২০২৬
মার্কিন নৌ-অবরোধের ফলে দেশটির তেল রফতানি ও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার কারণে এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় ৫৮০ কোটি ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ও বেআইনি নৌ-অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অন্যায় এই অবরোধের কারণে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় বর্তমানে দেশটি তার মোট তেলের ছয় ভাগের এক ভাগও বাইরে পাঠাতে পারছে না। দু’দেশের মধ্যে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলার মাঝেই তেহরানের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস তেল রফতানি বন্ধ করে দিতে ওয়াশিংটন এই নিষ্ঠুর পথ বেছে নিয়েছে।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গায়ের জোরে ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখায় মে মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল রফতানি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এই অন্যায় পদক্ষেপকে পুরোপুরি বেআইনি আখ্যা দিয়ে নিজেদের বন্দরের চারপাশে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের এই চড়াও হওয়াকে সরাসরি ‘জলদস্যুগিরি’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইল জোটের যৌথ বর্বর হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান যখন আত্মরক্ষার্থে বেশিভাগ দেশের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তখন থেকেই মার্কিন প্রশাসন এই নোংরা খেলায় নামে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের মূল পথ এই সংকীর্ণ নৌপথটি বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়। তবে সেই সময়টাতে অন্য দেশের তেল পারাপার ব্যাহত হলেও ইরান নিজের তেল ঠিকই রফতানি করতে পারছিল এবং চড়া দামের কারণে বেশ ভালো মুনাফাও ঘরে তুলছিল।
কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলো পুরোপুরি ছেঁকে ধরায় পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
ইরানের মোট তেল রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশই হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। নতুন তথ্য বলছে, মার্কিন এই জবরদস্তির কারণে ইরান এখন আর আগের মতো বাইরে, বিশেষ করে তার সবচেয়ে বড় বন্ধু রাষ্ট্র চীনের কাছে তেল বিক্রি করতে পারছে না।
বাণিজ্যবিষয়ক গবেষণা সংস্থা কেপলারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের আগে ইরান যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করছিল, মার্কিন আগ্রাসনে মে মাসে তা নাটকীয়ভাবে কমে দৈনিক মাত্র ৩ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকেছে। যুদ্ধের শুরুতে যখন তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ থেকে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখন মার্চ মাসেই ইরান তেল বিক্রি করে ৫১০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছিল। অথচ মে মাসে সেই আয় নির্মমভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র সাড়ে ৮৩ কোটি ডলারে, যা মার্চের তুলনায় প্রায় ৮৪ শতাংশ কম।
সব মিলিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, মার্চ মাসের আয়ের ধারা বজায় থাকলে মার্কিন অর্থনৈতিক সন্ত্রাসের কারণে গত এপ্রিল ও মে- এই দু’মাসেই ইরান প্রায় ৫৮০ কোটি ডলারের বিশাল রাজস্ব হারিয়েছে।
কেপলার অবশ্য আল জাজিরাকে জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী নতুন তেল বাইরে যাওয়া বন্ধ করলেও তেহরান দমে যায়নি; কিছু ইরানি তেল এখনো মালয়েশিয়ার কাছাকাছি সমুদ্রে গোপনে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে খালাস করে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, যা মার্কিন নজরদারি এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
তেল বিক্রি করতে মার্কিনরা বাধা দিলেও ইরান অবশ্য এখনো উৎপাদন বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করেনি। তবে বিক্রি না হওয়া বিপুল পরিমাণ তেল জমিয়ে রাখতে গিয়ে দেশটি এখন জায়গার সঙ্কটে ভুগছে।
জ্বালানি নীতি গবেষক মার্ক আইয়ুব আল জাজিরাকে জানান, ইরান তাদের অবশিষ্ট সব মজুত ক্ষমতা কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করছে, তবে এই ধারণক্ষমতা একবার শেষ হয়ে গেলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। বর্তমানে ইরানের প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সাগরে ভাসমান ট্যাংকারগুলোতে অবরুদ্ধ অবস্থায় জমা হয়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে আটকা পড়ে আছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যায় ব্যুহ ভেদ করে সামনে এগোনোর অপেক্ষায় দিন গুনছে।
ইরান এখন বিশালাকার তেলের ট্যাংকারগুলোকেই অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সাগরে নোঙর করে রেখে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছে দেয়ার নতুন পথ খুঁজছে।
সূত্র : আল জাজিরা