গাজায় নেই বিশ্বকাপের আমেজ

১১ জুন, ২০২৬

আজ বৃহস্পতিবার থেকে উত্তর আমেরিকার ঝলমলে স্টেডিয়ামগুলোতে শুরু হচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের বিশ্বজনীন মহোৎসব। যখন পুরো পৃথিবী মেতে উঠছে ফুটবল উন্মাদনায়, তখন গাজা সিটির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ‘প্যালেস্টাইন স্টেডিয়াম’-এর এক কোণে ক্রাচে ভর দিয়ে ফুটবল নিয়ে মেতে আছেন আলি তাফেশ ও তাঁর সতীর্থরা। তাঁরা ‘গাজা আল-ইরাদা’ ফুটবল ক্লাবের সদস্য- যে দলটি গঠিত হয়েছে ইসরায়েলি হামলায় হাত-পা হারানো যুদ্ধাহত ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের নিয়ে।

যেখানে প্রায় ৭৩ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, সেখানে এই ফুটবলারদের কাছে খেলাধুলা কেবল কোনো বিনোদন নয়; এটি তাঁদের বেঁচে থাকার, মানসিকভাবে টিকে থাকার এবং হারিয়ে যাওয়া জীবনের টুকরো অংশকে পুনরুদ্ধার করার এক মরিয়া মাধ্যম।

মাত্র চার বছর আগে, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় ২৪ বছর বয়সী আলি তাফেশ গাজার এক ক্যাফেতে বন্ধুদের সাথে উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা দেখেছিলেন। আজ ২০২৬ সালে পৃথিবী যখন আরেকটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সাক্ষী হচ্ছে, আলি তখন যুদ্ধাবস্থার মাঝে অঙ্গ হারানো হাজারো মানুষের একজন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় তাঁদের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলির মা ও ভাই শহীদ হন এবং চিকিৎসকেরা আলির একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এর আগে তিনি একজন স্থানীয় স্প্রিন্টার (দৌড়বিদ) ছিলেন এবং আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। পা হারানোর পর জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলা আলি ৬ মাস আগে বন্ধুদের মাধ্যমে ‘গাজা আল-ইরাদা’ ক্লাবের খোঁজ পান।

আল জাজিরাকে আলি বলেন, “পা কাটার পর আমি জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি একজন চ্যাম্পিয়ন ছিলাম, আমার মেডেল ছিল। কিন্তু এই ক্লাবের বন্ধুরা যখন আমার সাথে দেখা করতে এলো, আমি খেলি। এখন আমরা খুব সামান্য যা আছে তা নিয়েই ফুটবলকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করছি।”

তবে বিশ্বমঞ্চের তারকাদের চেয়ে আলিদের বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত। গাজায় কোনো গণপরিবহন নেই। আলিকে দুই ঘণ্টা ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে মাঠে আসতে হয়। খেলার জন্য ভালো ক্রাচ, বুট বা কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জামও তাঁদের কাছে নেই।

দলের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ খেলোয়াড় সাআদি আল-মাসরির গল্পটা একটু ভিন্ন। দুই বছর বয়সে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় পা হারানো সাআদি একজন জাতীয় সাঁতারু, ভলিবল খেলোয়াড় এবং ফিলিস্তিনের জাতীয় অ্যামপুটি (অঙ্গহীন) ফুটবল দলের প্রতিনিধি। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দেশের পতাকা বহন করার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে।

সাআদি বলেন, “বিশ্বকাপ দেখা আমাদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। আমাদের দলটির এবার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের কোয়ালিফায়ার খেলার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ সব শেষ করে দিয়েছে। তীব্র কষ্টের বিষয় হলো, আজ আমরা বিশ্বমঞ্চে অনুপস্থিত এবং পুরোপুরি বিস্মৃত।”

তিনি ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফিফা ফিলিস্তিনি ফুটবলের পুনর্গঠনে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেনি। যদিও গত ফেব্রুয়ারিতে ফিফা গাজায় ৫০টি মিনি-পিচ, ৫টি পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম ও একটি একাডেমি গড়ার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু সাআদিদের মতে, সেগুলো এখনো কেবল ‘কাগজের প্রতিশ্রুতি’ হিসেবেই রয়ে গেছে। ২০২২ সালের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, “তখন আমরা ঘরে বা ক্যাফেতে খেলা দেখতাম। আর আজ গাজায় বিদ্যুৎ নেই, স্ক্রিন নেই, এমনকি মোবাইলেও খেলা দেখার মতো ইন্টারনেট সুবিধা নেই।”

২০১৮ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত ‘গাজা আল-ইরাদা’ ক্লাবটি মূলত যুদ্ধ ও দুর্ঘটনায় অঙ্গ হারানো মানুষদের ক্রীড়াঙ্গনে ফিরিয়ে আনার কাজ করে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে গাজায় প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ হাত বা পা হারিয়েছেন।

ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গত মার্চের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলমান ইসরায়েলি হামলায় গাজার ক্রীড়াঙ্গনের ১,০০৭ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন, যার মধ্যে খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি ও কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া ফুটবল মাঠ, জিমনেসিয়াম ও সুইমিং পুলসহ ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গাজার মূল স্টেডিয়ামগুলোর অনেকগুলোই এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

দলের কোচ হাতেম আল-মুগরেবি মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, “বিশ্বকাপ আমাদের কাছে ফুটবলের উৎসবের পাশাপাশি এক তীব্র একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার বার্তা নিয়ে এসেছে। আমাদের খেলোয়াড়েরা বিশ্বের অন্য অ্যাথলেটদের মতো এই টুর্নামেন্ট উপভোগ করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের ওপর প্রতিদিন বোমা আর মৃত্যুর মিছিল চলছে।”

আজ যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ফুটবলাররা মাঠে নামবেন, তখন গাজার এই যোদ্ধাদের একটাই বার্তা- বিশ্ব যেন ফিলিস্তিনের মানুষদেরও বেঁচে থাকার যোগ্য মনে করে এবং গ্যালারি ও স্টেডিয়ামগুলোতে যেন ফিলিস্তিনের দুর্দশার কথা ফুটবলবিশ্ব ভুলে না যায়।