১৮ জুন, ২০২৬
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে পাকিস্তান। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ পিএনএস তৈমুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশটির নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা কমোডর ওমর ফারুক এই কৌশলগত পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেন।
কলম্বো-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য মর্নিং’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ নামের একটি সাবমেরিন তৈরি করেছে চীন। সাবমেরিন গত এপ্রিলে চীনে কমিশনিং হয়ে গত সপ্তাহে করাচিতে পৌঁছেছে। সাবমেরিনটিকে নিয়ে আসতে নৌবাহিনীর একটি বহর নিয়ে চীনে গিয়েছিলেন কমোডর ওমর ফারুক। ফিরে আসার পথে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে যাত্রাবিরতি নিয়েছিলেন তিনি।
সেখানেই পাকিস্তান নৌবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এই সাবমেরিন ইসলামাবাদকে এমন সক্ষমতা দেবে যাতে তারা বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি বজায় রাখতে পারে।
মূলত হাঙ্গর নামের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গর বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ভারতের আইএনএস খুকরি ডুবিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর কোনো যুদ্ধজাহাজ ডোবার এটিই ছিল প্রথম ঘটনা এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর অন্যতম প্রশংসিত নৌ-আক্রমণ।
তবে, আইএনএস খুকরির ডোবার ঘটনাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ফলাফলে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। যুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর বঙ্গপোসাগর ছেড়ে চলে যায় পাকিস্তান এবং এর পর থেকে পাকিস্তানি নৌ উপস্থিতি মূলত উত্তর আরব সাগরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত সংঘর্ষের পঁচান্ন বছর পর, আরেকটি পাকিস্তানি হ্যাঙ্গর এখন খবরের শিরোনামে। এই সাবমেরিনগুলো 'এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপেলার' (এআইপি) প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, যার ফলে এগুলো পানির রিফুয়েলিং বা অক্সিজেন ছাড়াই দীর্ঘ সময় পানির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে। পাকিস্তান এই শ্রেণির মোট আটটি সাবমেরিন তাদের নৌবহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার ৪টি চীনে এবং বাকি ৪টি প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে পাকিস্তানে তৈরি হবে।
এদিকে বঙ্গোপসাগরে ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের ব্যাপক আধিপত্য এবং উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে। বিশাখাপত্তনমে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নৌ কমান্ডের অবস্থান এবং আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের নৈকট্যের কারণে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য বঙ্গোপসাগর ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাকে উপকূলবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে নিয়ে গঠিত এই জলরাশিটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌ-শক্তিগুলোর উত্থানের প্রেক্ষাপটে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও অর্জন করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার করা মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তার এই মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ইসলামাবাদ দেশের অভ্যন্তরীণ উপকূলীয় প্রতিরক্ষার বাইরে গিয়ে ভারত মহাসাগরে একটি বৃহত্তর অভিযানিক অবস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে, যা তাকে গভীর সমুদ্রে ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
যদিও বঙ্গোপসাগর কোনো একটি দেশের আঞ্চলিক সমুদ্র নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো (ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার) তাদের উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত আঞ্চলিক সমুদ্রের উপর সার্বভৌমত্ব এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) উপর সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে।
সেই সীমার বাইরে রয়েছে আন্তর্জাতিক জলসীমা, যেখানে এমনকি বিদেশি সামরিক জাহাজগুলোও মূলত অবাধে চলাচল করতে পারে। কিন্তু ভারতের জন্য বঙ্গোপসাগর দীর্ঘকাল ধরেই একটি কৌশলগত প্রাঙ্গণ। এখানেই রয়েছে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নৌ কমান্ড, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগ পথ, দ্বীপ অঞ্চল এবং অবশ্যই, নয়াদিল্লির ইন্দো-প্যাসিফিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
অন্যদিকে নতুন হ্যাঙ্গর সাবমেরিনের কমিশনের সময় এবং বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ— দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেখ হাসিনার সরকারের পতন হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলে শুরু হওয়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার সামরিক সম্পৃক্ততাসহ সম্পর্কের দৃশ্যমান উন্নতির মধ্যেই এই ঘটনাটি ঘটল।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম সামরিক ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা, যা ভারতের কাছে একটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাড়াবে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে