পদত্যাগের জোয়ার তৃণমূল কংগ্রেসে

২০ জুন, ২০২৬

বিধানসভায় পরিষদীয় দল ও লোকসভায় সংসদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর এবার নিজের হাতে গড়া দলের নাম, নির্বাচনী প্রতীক এবং হাজার কোটি রুপির তহবিল নিয়েও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সিনিয়র ও জুনিয়র নেতাদের একাংশ ধারাবাহিকভাবে তার সঙ্গ ছাড়ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে, ফলে ক্রমেই আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন মমতা।

শুক্রবার (১৯ জুন) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানে নতুন করে ধাক্কা দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক মন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক দল ছাড়ার ঘোষণা দেন।

এদিকে একের পর এক নেতা-কর্মীর পদত্যাগ ও দলত্যাগের ঘটনায় তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে রাজনৈতিকভাবে আরও চাপে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর শেষবার গত শনিবার দলের সাংগঠনিক পদে রদবদল করা হয়েছিল। তৃণমূলের ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটিতে (জাতীয় কর্ম সমিতি) জায়গা দেওয়া হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা হয়েছিল জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে। কিন্তু এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই সেই পদ থেকে ইস্তফা দিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক এই মন্ত্রী। শুক্রবার তিনি তার এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে।

নিজের শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে মমতা ঘনিষ্ঠ এই তৃণমূল নেতা মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে হাতে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছি। আমার ৩৫০-এর ওপর সুগার, কিডনিও খারাপ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসকদের পরামর্শে আমার সম্পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন এবং কোনপ্রকার মানসিক ও শারীরিক চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, দলের জাতীয় কর্ম সমিতির সদস্যপদের দায়িত্ব পালনে অব্যাহতি চেয়ে নিলাম।’

জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ১৯৯৮ সালে দলের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সঙ্গে ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে পরপর তিনটি মেয়াদে হাবড়া আসন থেকে বিধায়ক হন। তারও আগে গাইঘাটা আসনের বিধায়ক ছিলেন তিনি। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য ও খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। এরপর বন (ফরেস্ট) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় দলের সংগঠন বিস্তারে গত ২ দশক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল জ্যোতিপ্রিয়র ওপর।

যদিও রেশন দুর্নীতি মামলায় ২০২৩ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে অ্যানফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এরপর কারাগারে যেতে হয় তাকে। পরে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরেও তার পাশেই ছিলেন দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে ফাঁসানো হয়েছিল বলেও দাবি করেছিলেন মমতা। এমনকি সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ সালের বিধানসভার নির্বাচনেও তার ওপর ভরসা রেখে তাকেই হাবড়া আসনে চতুর্থবারের জন্য প্রার্থী করেছিল দল।

যদিও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা এমন একজন নেতাকে নির্বাচনে প্রার্থী করায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। তাকে প্রার্থী করার পর দলের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা যায়। দুর্নীতির অভিযুক্ত সেই জ্যোতিপ্রিয়কে যে হাবড়ার মানুষ গ্রহণ করেনি তা নির্বাচনের ফলাফলই পরিষ্কার। এই নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী দেবদাস মন্ডল এর কাছে পরাজিত হতে হয় তাকে। এমনকি এই নির্বাচনে তার দল তৃণমূল কংগ্রেস ও পর্যদুস্ত হয় গেরুয়ার শিবিরের কাছে। রাজ্যের ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল জয় পায় ৮০ আসনে। নির্বাচনে ভরাডুবির পরই দলে ভাঙন শুরু হয়। দলের অন্দরে তৈরি হয় কোন্দল। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ আঙ্গুল তুলে ইতিমধ্যেই কেউ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, কেউ নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় এবং সংসদেও তৃণমূল ভেঙে তৈরি হয়েছে আরেকটা তৃণমূল। গত ১৫ বছরের শাসন ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের একাধিক নেতা নেত্রীর বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতি, তোলাবাজি, হুমকি প্রদর্শন, বেআইনি নির্মাণ, পায়ে বহির্ভূত সম্পত্তি গড়ে তোলা সহ একাধিক অভিযোগ। দিন যত যাচ্ছে, সেই সমস্ত তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে জায়গায় জায়গায় জনরোষ ছড়িয়ে পড়ছে।

কিন্তু দল যখন বিপাকে, একে একে মমতাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তারই ঘনিষ্ঠ নেতা-নেত্রীরা... সেসময় মমতার সঙ্গ ছাড়লেন বালুও।

অন্যদিকে এদিনই শিলিগুড়ি পৌরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন গৌতম দেব। পুর কমিশনার অশ্বিনী কুমার রায়ের হাতে ইস্তফা পত্র তুলে দেন গৌতম দেব। তবে কী কারণে এই ইস্তফা তা এখনও জানা যায়নি।

২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্র থেকে জিতে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী হয়েছিলেন গৌতম। ২০১৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর পর্যটনমন্ত্রী হন তিনি। ২০২১ সালের নির্বাচনে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি আসনে দাঁড়িয়ে বিজেপি প্রার্থী শিখা চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যান। ২০২৬ সালে শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হয়েও জয়ের মুখ দেখতে পারেননি তিনি। হেরে যান বিজেপি প্রার্থী তথা রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের কাছে। এরই মাঝে ২০২২ সালের শিলিগুড়ি পুরনিগমের নির্বাচনে গৌতমের নেতৃত্বে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। এবার সেই পুরনির্বাচনও হাতাছাড়া হচ্ছে তাদের।

এছাড়াও শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন নবদ্বীপ পৌরসভার পৌর প্রধান শচীন্দ্র বসাক। আলিপুরদুয়ার পৌরসভার চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ কর।

এর আগে বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেছেন বহরমপুর পৌরসভার পৌর প্রধান নাড়ু গোপাল মুখোপাধ্যায়। ব্যারাকপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান উত্তম দাস। বেলডাঙা পৌরসভার চেয়ারম্যান অনুরাধা হাজরা। উত্তর দমদম পৌরসভার চেয়ারম্যান বিধান বিশ্বাসসহ প্রায় ৩০টি পৌরসভার চেয়ারম্যান। পদত্যাগ করেছেন ২ শতাধিকের বেশি পৌর কাউন্সিলর।

দুর্নীতির দায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে অশোকনগর পৌরসভার চেয়ারম্যান প্রবোধ সরকারসহ বেশ কয়েকজন চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলকে। নির্বাচনের পরে অনেকেই আবার বেপাত্তা।

পশ্চিমবঙ্গের তিন হাজার পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ ও ১২৮ পৌরসভায় রীতিমতো পদত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। আর প্রতিদিনই রাজনৈতিক শক্তি একটু একটু করে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে একবার হেরেই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছেন মমতা।

কিন্তু কেন ওই পদত্যাগের জোয়ার? পদত্যাগীরা বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবথেকে বড় ভুল হেরে যাওয়ার পরে হার স্বীকার করে না নেওয়া। এতে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা গিয়েছে। মাঠে ময়দানে নেমে তাদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একটানা ১৭ বছর ব্যারাকপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন উত্তম দাস। পদত্যাগের পর তিনি বলেছেন, মানুষ আমাদের দল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই সমস্ত দায়ভার নিয়ে আমি চেয়ারম্যান এবং দলের সব পদ থেকে পদত্যাগ করছি।

এর আগে মমতাকে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা দিয়েছেন কলকাতার সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিম ওরফে ববি হাকিম। তিনিও আসল তৃণমূল দাবী করা ঋতব্রত তৃণমূলে মিশে গিয়েছেন ছেড়েছেন কালীঘাট তৃণমূলের সমস্ত পদ।

রাজনৈতিক এই ধাক্কা নিজের পরিবারেও ভালোভাবেই অনুভব করছেন মমতা। মমতার ভাই বাবন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে ভাই বউ কাজরি বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শুভেন্দু অধিকারী কে মমতার থেকে বেশি আপন করেছেন তারা।

পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে চলতি বছরের শেষে আসন্ন ১২৮ পৌর নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার মত অবস্থায় নেই তৃণমূল কংগ্রেস। এমন পরিস্থিতিতে পৌর নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘর গোছাতে শুরু করেছে বিজেপি। যেখানে সাফল্য পেলে বিজেপি গ্রাসরুটে প্রশাসনিক পর্যায়ে যেমন পায়ের তলায় যেমন মাটি পাবে তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্তি একেবারেই তলানিতে ঠেকবে।