কলকাতার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউর নাম পরিবর্তন

২২ জুন, ২০২৬

কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউর নাম বদলে গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড করার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিজেপি সমর্থকরা এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’ বলে দাবি করলেও, বিরোধীদের অভিযোগ, উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার বদলে ইতিহাসের নামফলক পাল্টানোই বিজেপির অন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।

কলকাতা পৌর করপোরেশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ এখন থেকে সরকারি নথিতে গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড নামে পরিচিত হবে।

সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সমাজমাধ্যমে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দাবি করেন, প্রকৃত নায়কদের সম্মান জানানোর সময় এসেছে। পাশাপাশি ইতিহাসের ভুল সংশোধনের সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিজেপি সমর্থকদের দাবি, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে গোপাল মুখোপাধ্যায় তথা গোপাল পাঁঠা যেভাবে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই তার নামে রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।

বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, বাংলার ইতিহাসে যাদের অবদান উপেক্ষিত হয়েছে, তাদের সামনে আনার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নানা শহর ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের যে প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত রাজনৈতিক বার্তা দেয়ার কৌশল। তাদের মতে, ইতিহাসকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার নামে নির্বাচিত কিছু নামকে তুলে ধরা হচ্ছে এবং অন্য অংশকে আড়ালে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে।

ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট-এর সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৩৩ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট, এই নবনির্মিত ১০০ ফুট চওড়া রাস্তাটির নামকরণ করেছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাকা, স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর সম্মানে।

কে ছিলেন এই স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী?

স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী (১৮৮৪–১৯৪৬) ছিলেন একাধারে এক অত্যন্ত সম্মানিত চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদ। ১৯৩৩ সালে যখন এই রাস্তাটি তৈরি হয়, তখন এই অঞ্চলেই স্যার হাসানের পারিবারিক বাসস্থান ‘কাশানা’য় অবস্থিত ছিল। মূলত সেই কারণেই তার নামে এই অ্যাভিনিউয়ের নামকরণ করা হয়। প্রায় এক শতাব্দী পর সেই নামই বদলে দেয়া হলো।

কে ছিলেন এই গোপাল মুখার্জি?

গোপাল মুখার্জি (১৯১৩–২০০৫), শহরবাসীর কাছে ‘গোপাল পাঁঠা’ (পারিবারিক মাংসের ব্যবসার সূত্রে) নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার সময় এক কিংবদন্তি চরিত্র হয়ে ওঠেন তিনি। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে তিনি স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করে সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলেন এবং পাল্টা আঘাত হেনে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করেন। কলকাতার একটি বড় অংশের মানুষের কাছে তিনি তৎকালীন গণহত্যার হাত থেকে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো এক ‘ত্রাতা’ হিসেবে গণ্য হন। যদিও বাংলার দাঙ্গার ইতিহাসে তার এই ভূমিকা আজও এক অত্যন্ত চর্চিত ও বিতর্কিত অধ্যায়।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ডাকা ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ওই দিনটিই কলকাতার ইতিহাসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ বা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়।

তৎকালীন রাজ্য প্রশাসনকে ব্যবহার করে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বজায় রাখা এবং দাঙ্গাবাজদের পরোক্ষ মদদ দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ভারতীয় ইতিহাসে ভারতীয়রা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দাঙ্গার সময় নেয়া তার সিদ্ধান্ত ও ভূমিকাতে খুব ভালোভাবে দেখেন না। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং ১৯৫০-এর দশকে সেখানকার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলান।

এর জেরেই কলকাতার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিশ্বাস করে এসেছে যে, রাস্তাটি হয়তো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণেই তৈরি। ফলে এই নামটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় স্তরে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ পুঞ্জীভূত ছিল।

১৯৪৬ সালের দাঙ্গার যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতির সঙ্গে এই নামটি জড়িয়ে থাকায়, সম্প্রতি কলকাতা পৌরসংস্থা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে তা রাখা হয়েছে গোপাল মুখার্জি রোড।