মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে জাপানে বিতর্ক

২৯ জুন, ২০২৬

অন্যান্য অনেক দেশে এটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, জাপানে একজন মেয়রের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।জাপানের মেয়র শোকো কাওয়াতা যখন মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ঘোষণা দেন, তখন বিষয়টি দেশজুড়ে শিরোনাম হয়, জনমত জরিপ শুরু হয় এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

মে মাসে তার এই ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে। সোমবার পশ্চিম জাপানের ইয়াওয়াতা শহরের বিধানসভায় কাওয়াতা বলেন, তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি মেয়র প্রশাসনিক কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবেন বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।

এরপর জাপানের সংবাদপত্র মাইনিচি শিম্বুনর এক সম্পাদকীয়তে তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, কর্মীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

সম্পাদকীয়তে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘জাপানকে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই মাতৃত্ব বা পিতৃত্বকালীন ছুটি নিতে পারে।’

ভিডিও কলে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাওয়াতা বলেন, ‘আমি ভাবিনি বিষয়টি এত বিতর্কিত হবে। এখনো এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, কর্মজীবনে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করতে হলে ব্যক্তিগত জীবনকে ত্যাগ করতে হবে।’

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান বর্তমানে জনসংখ্যা হ্রাসের গুরুতর সংকটের মুখোমুখি।

দেশটিতে কর্মজীবী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির আইন থাকলেও, সেই আইন নির্বাচিত নগর মেয়রদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়।

৩৫ বছর বয়সী কাওয়াতা জাপানের প্রথম দায়িত্ব পালনরত মেয়র যিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি নিচ্ছেন। নিজের এই পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, অনলাইনে অনেক মানুষ এখন ধীরে ধীরে বিষয়টি মেনে নিতে শুরু করেছেন।’

এই ঘটনা জাপানে কর্মজীবন, পরিবার এবং নারীর নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘পুরুষদের ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদান তাদের শরীরে শারীরিকভাবে কোনো প্রভাব ফেলে না, তাই ব্যক্তিগত জীবনকে পেছনে ফেলে কাজ চালিয়ে যাওয়া প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব।

কিন্তু নারীদের জন্য শারীরিকভাবে তা একেবারেই সম্ভব নয়।’

সর্বশেষ জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে, জাপান ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১১৮তম স্থান অধিকার করেছে, যা জি৭ দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এর একটি কারণ হলো সেকেলে লিঙ্গভিত্তিক গতানুগতিক ধারণা। এখন পর্যন্ত, জাপানে মাত্র ৩০ শতাংশ কাউন্সিলর নারী এবং তাদের মধ্যে মাত্র ১.২ শতাংশের বয়স ৪০-এর নিচে।

তিনি আরো বলেন, ‘যদিও জাপানে লিঙ্গ সমতার উন্নতি হয়েছে, তবুও নারীরা প্রায়ই নেতৃত্বের পদে পৌঁছাতে সংগ্রাম করেন।’ ৩৩ বছর বয়সে কাওয়াতা শিশুযত্ন ব্যবস্থার উন্নতির এজেন্ডা নিয়ে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালিয়ে জাপানের সর্বকনিষ্ঠ নারী মেয়র হন। যদিও তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য নন, কাওয়াতা অল্প বয়স থেকেই রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন।

কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করার পর তিনি কিয়োটো শহরে একজন কেস ওয়ার্কার হিসেবে কাজ শুরু করেন, পরে রাজনৈতিক সহকারী হন এবং ২০২৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হন।

এর পরের তিন বছরে কাওয়াতা তার দক্ষতা ব্যবহার করে জাপানজুড়ে প্রচলিত একটি সমস্যা, জনসংখ্যা হ্রাস মোকাবেলা করার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। কাওয়াতার নির্বাচনী এলাকাটি প্রিফেকচারের অন্যতম ছোট এলাকা। সেখানে ২০০২ সালে জনসংখ্যা ছিল ৭৪ হাজার ৩২৯ জন। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তা কমে ৬৭ হাজার ৮৭৬ জনে নেমে এসেছে।

কাওয়াতা বলেন, ‘জাপানের জনসংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমি সবসময়ই জানতাম। তবে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যাটির প্রকৃত গুরুত্ব ও গভীরতা আরো ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি।’ তার মতো পদে থাকা কোনো নারীর জন্য এটি প্রথম মাতৃত্বকালীন ছুটি হওয়ায় কাওয়াতাকেই এর পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। তিনি জাতীয় নিয়ম অনুসরণ করে ডিসেম্বরের মধ্যে কাজে ফেরার আশা করছেন।

প্রথম সন্তানের মা হতে যাওয়ায় ভবিষ্যতে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন, তা তিনি এখনো জানেন না। তবে তিনি আশা করেন, তার এই সিদ্ধান্ত জাপানের আরো বেশি নারীকে রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করবে।

কাওয়াতা বলেন, ‘যদি আরো বেশি নারী নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে অংশ নেন, তাহলে কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক আরো ভালো সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’