০৪ জুলাই, ২০২৬
সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিদ্রোহী শিবিরের দাবি এবং পাল্টা দাবির মধ্যেই কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত প্রধান দলীয় কার্যালয় দখল করে নিয়েছেন বিদ্রোহীরা।
শুক্রবার সন্ধ্যার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই গোষ্ঠীটি নিজেদের ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’ দাবি করে প্রধান কার্যালয় দখলে নেয়। এসময় ঋতব্রতের সঙ্গে ছিলেন আখতারুজ্জামান, ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, গোলাম রব্বানী, প্রসূণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার মতো শীর্ষ নেতা ও বিধায়করা।
ওই সময় দলীয় কার্যালয় অবস্থান করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সাবেক মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ঋতব্রতরা ভেতরে প্রবেশ করার পর তিনি ভবন ছেড়ে চলে যান।
তবে চন্দ্রিমা চলে যাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনের সামনে উপস্থিত হন ‘মমতাপন্থি’ তৃণমূল নেতা ও বিধায়ক কুনাল ঘোষ এবং আরও কয়েক জন। কুণালেরা পৌঁছোনোর কিছু ক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীও। কার্যালয় ‘দখল’ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কুণালকে কথা বলতে দেখা যায়।
কুণাল জানান, কী হয়েছে পুরো বিষয়টি বোঝার পরেই দলীয় নেতৃত্বকে জানাবেন তিনি। অর্থাৎ মমতা বা অভিষেকের সঙ্গে কথা বলবেন। নেতৃত্বের নির্দেশ মতোই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
পার্টি অফিস ‘দখলের’ বিষয়ে পুলিশকে তিনি জানান, ২০২৭ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সঙ্গে এই ভবন নিয়ে মালিকের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে।
তবে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা কুণালদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তারা কখনই তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকতে পারবেন না। তালা খুলে যদি ঢুকতে চান, তাতে পুলিশের কোনও আপত্তি নেই।
এদিকে,কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকায় কার্যালয় দখলের পর ভবনের পুরোনো ব্যানার সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের পরিবর্তে হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়কে দলের নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করে নতুন ব্যানার লাগানো হয়েছে।
তৃণমূলের জ্যেষ্ঠ এবং বর্তমানে ‘ঋতব্রতপন্থি’ বিধায়ক আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “‘আমরাই তৃণমূল। এটা আমাদের কার্যালয়। এই কার্যালয়ের সঙ্গে তৃণমূলের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।”
আখতারুজ্জামান আরও জানান, তারা মালিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভাড়া-সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
উল্লেখ্য,৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—‘আসল’ তৃণমূল কারা। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল বিধায়ক দলের অন্দরে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার পর থেকেই দলে ভাঙন শুরু হয়।
ঋতব্রতের তৃণমূল বনাম মমতাপন্থী তৃণমূলের তরজা এখনও চলছে। ‘আসল’ তৃণমূলের দাবি জানাচ্ছে দু’পক্ষই। সেই আবহে শুক্রবার দলীয় কার্যালয় ‘দখল’ করেন ঋতব্রতেরা। ভবনের বাইরের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা। সঙ্গে করে চাবি নিয়ে চলে যান। খবর পেয়েই ওই কার্যালয়ে পৌঁছে যান কুণাল। ঘটনাচক্রে, এই পার্টি অফিসটি কুণালের বিধানসভা এলাকার মধ্যেই পড়ে।
এই ‘দখলদারির’ নেপথ্যে রাজ্য সরকার এবং পুলিশের মদত রয়েছে বলে অভিযোগ করে সাংবাদিকদের কুনাল ঘোষ বলেন, ‘‘দখলদারির সংস্কৃতি চলছে। সরকার এবং পুলিশের প্রত্যক্ষ মদতে একজন বহিষ্কৃত (ঋতব্রত) বিজেপির বি টিম হয়ে নেমেছে।’’
গত ২১ জুন কলকাতার নিউ টাউন এলাকার একটি হোটেলে বৈঠক করে মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ‘তৃণমূলের’ জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করে ফেলেছিলেন ঋতব্রত এবং তার সহযোগীরা। সেই বৈঠকে তৃণমূলের চেয়ারম্যান হিসাবে হাওড়া মধ্য বিধানসভার বিধায়ক অরূপ রায়কে বেছে নেওয়া হয়।
কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকার এই কার্যালয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান দলীয় কার্যালয়। বিগত কয়েক দিন ধরে এ কার্যালয় ভবন জটিলতা তৈরি হয়েছে। ভবনের মালিক মালিক মনোতোষ সাহা, তবে মন্টু সাহা নামেই তিনি বেশি পরিচিত। মন্টুর মালিকানাধীন ‘মডার্ন ডেকোরেটিং’ ভোটের আগে পর্যন্ত তৃণমূলের সমস্ত কর্মসূচিতে মঞ্চ বাঁধার বরাত পেত। এমনকি ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের প্রশস্ত মঞ্চটিও তৈরি করত মডার্ন ডেকোরেটিং।
ভোটের ফল বেরোনোর পর অবশ্য মন্টু আর তৃণমূলের সম্পর্কের রসায়ন বদলে যায়। তৃণমূলকে ওই ভবন ছাড়তে বলেন মন্টু। তিনি দাবি করেন যে, বার বার বলার পরেও ওই ভবন খালি করছে না তৃণমূল। জানা গেছে, সেই মন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করেই শুক্রবার প্রধান কার্যালয়ের ‘দখল’ নিয়েছে ঋতব্রত শিবির।
সম্প্রতি ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ ঘিরে টানাপড়েন দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের দুই শিবিরে। মমতাপন্থি তৃণমূল এবং ঋতব্রতের তৃণমূল বাগ্যুদ্ধে জড়িয়েছিল। দু’দলই চেয়েছিল ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সমাবেশ করবে। কিন্তু কলকাতা পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষকেই অনুমতি দেয়নি।
সূত্র : আনন্দবাজার