১৪ হটস্পটে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু

০৬ জুলাই, ২০২৬

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী। একসময় ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও এখন দেশের বিভিন্ন জেলা নতুন করে সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার বাইরে ১৪ জেলায় বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা রয়েছে। 

এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, চট্টগ্রামে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এই এলাকাগুলো এডিস মশার হটস্পট হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই উদ্যোগ না নিলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এসব এলাকার অনেক জায়গায় মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো জনবল, যন্ত্র, বাজেট নেই। তাই স্থানীয় সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, পৌরসভাগুলোতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত বাজেট, যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুরোগী বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং মারা গেছেন ১৯ জন। বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যায় বরিশাল বিভাগ (১,৭৩৫) শীর্ষে, এরপর চট্টগ্রাম (১,২০১), ঢাকা মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগ (৭৯৮), ঢাকা উত্তর সিটি (৫৪৯) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি (৯৩১)। 

মাসভিত্তিক হিসেবে জুন মাসে আক্রান্ত ২ হাজার ৯০৭ জন। এ সংখ্যা আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। যা মৌসুমের তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। মোট ডেঙ্গু রোগীর ৭৭ দশমিক ১ শতাংশই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে। পরিসংখ্যানে নজর দিলে দেখা যায় ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। বরিশাল বিভাগ একাই মোট আক্রান্তের প্রায় ২৭ শতাংশ, যা সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। জেলাগুলোর মধ্যে পিরোজপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের তালিকায় রয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার দুই মাস ধরে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লার্ভা ধ্বংস করার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল ট্যাবলেট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট জায়গায় জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা বা টায়ারে এই ট্যাবলেট ব্যবহারে লার্ভা দ্রুত ধ্বংস হবে।’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো কীটতত্ত্ববিদের অভাব। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন কীটতত্ত্ববিদ রয়েছেন। বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। এ ছাড়া দেশের মাত্র ২৬টি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কীটতত্ত্ববিদের অনুমোদিত পদ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয় ও সদর দপ্তরসহ অনুমোদিত ৩৩টি পদের অন্তত ১৮টি খালি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কীটতত্ত্ববিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মশার প্রজাতি, বিস্তার, প্রজননস্থল, কীটনাশকের কার্যকারিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করতে সক্ষম। তাদের পরামর্শ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় না। 

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এবার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে জেলা শহর ও পৌর এলাকাগুলো। সেখানে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঢাকার তুলনায় আরও দুর্বল। ফলে একবার সংক্রমণ শুরু হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় অভিযান অনেক সময় মৌসুমি কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকে। নর্দমা পরিষ্কার না হওয়া, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, ছাদে খোলা পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং জলাবদ্ধতা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আগামী দুই মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।