০৬ জুলাই, ২০২৬
একটি যন্ত্র। স্থানান্তর করা যায় একদিক থেকে আরেকদিক। সূর্য যেদিক কিরণ দেয় সেদিকে করা যায় মুখ। যার শক্তিতে মাটির গভীর থেকে উঠে আসে পানির ধারা। সেই পানি জমির আল বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
অভিনব এ যন্ত্রের পেছনের কারিগর সোলেমান আলী। তার বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী গ্রামে। জ্বালানি তেলের সংকট আর লোডশেডিংয়ের দুশ্চিন্তা যখন কৃষকদের নিত্যসঙ্গী, তখন সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে তিনি খুঁজে পেয়েছেন ভিন্ন এক সমাধান। তৈরি করেছেন স্বল্প খরচে ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র—যা এক খেত থেকে আরেক খেতে নিয়ে সহজেই ব্যবহার করা যায়।
সোলেমানের শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না। অভাবের কারণে প্রথম শ্রেণির পরই থেমে যায় তার পড়াশোনা। জীবিকার তাগিদে শুরু করেন সাইকেল মেরামতের কাজ। ধীরে ধীরে যুক্ত হন ইনস্ট্যান্ট পাওয়ার সাপ্লাই (আইপিএস) তৈরির সঙ্গে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ। ২০১৩ সালে শুরু করেন সৌর সেচব্যবস্থা নিয়ে কাজ।
বছরের পর বছর ধরে বাজারের বিভিন্ন সৌর প্যানেল, কন্ট্রোলার ও যন্ত্রাংশ জোগাড় করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান সোলেমান। একসময় তৈরি করেন নিজের সৌর সেচযন্ত্রের মডেল। পরে সেটিকে আরও উন্নত করতে পাম্পে যুক্ত করেন গিয়ার বক্স, যাতে দ্রুত পানি ওঠে। সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী প্যানেল ঘোরানোর ব্যবস্থা করেন। পুরো কাঠামোয় চাকা বসিয়ে এটিকে করে তোলেন ভ্রাম্যমাণ। কৃষকের জমিতে সেচ পাম্পের বোরিং করাই থাকে। সেখানে সোলেমানের সৌর সেচযন্ত্র নিয়ে গিয়ে স্থাপন করলেই পানি তোলার উপযোগী হয়ে যায়।
সোলেমানের তৈরি সৌর সেচযন্ত্রে ১০টি সৌরকোষ রয়েছে, প্রতিটির ক্ষমতা ২৫০ ওয়াট। মোট ২ হাজার ৫০০ ওয়াট ক্ষমতার এই প্যানেল সূর্যের আলো পেলেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, যা দিয়ে তিন হর্সপাওয়ারের পানির পাম্প চালানো হয়। প্রতি মিনিটে ন্যূনতম ৭০০ লিটার পানি তোলা যায়, এক দিনে প্রায় ১০ একর জমিতে সেচ দেওয়া যায়।
সোলেমানের সেচযন্ত্রের খরচও তুলনামূলক কম। ভালো মানের এক ওয়াট সৌরকোষের দাম পড়ে ২৮ টাকা। সেই হিসাবে ২ হাজার ৫০০ ওয়াটের সৌর প্যানেলের দাম পড়ে ৭০ হাজার টাকা। পানির পাম্প কেনা ও প্যানেলের অবকাঠামো তৈরিতে খরচ পড়ে আরও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ সৌর সেচযন্ত্র তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
প্রতিটি সেচযন্ত্র ভাড়া দিয়ে বছরে ৩৬ হাজার টাকা করে পান সোলেমান। পাশাপাশি কেউ সেচযন্ত্রটি কিনতে আগ্রহী হলে তিনি তা বিক্রি করেন। মানভেদে প্রতিটি সেচযন্ত্রের দাম পড়ে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। পাশাপাশি দেন কারিগরি সেবাও। এ পর্যন্ত শতাধিক সৌর সেচযন্ত্র তৈরি করে বিক্রি করেছেন তিনি। আর ছয়টি সেচযন্ত্র নিজে ব্যবহার করছেন তিনি। ভাড়ায় খাটছে ২০টি সেচযন্ত্র।
যেখানে সাধারণ সেচযন্ত্র দিয়ে প্রতি বিঘায় খরচ হয় সাত থেকে আট হাজার টাকা, সেখানে সৌর সেচযন্ত্রে তা নেমে এসেছে তিন হাজার টাকায়।
সদর উপজেলার কৃষক আতাউর রহমান খেতে সৌর সেচযন্ত্র ব্যবহার করে সেচকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের চিন্তা নেই, পেট্রোল-ডিজেলের ঝামেলাও নেই—সময়মতো পানি দিতে পারছি, ফলনও ভালো হচ্ছে। সেচে টাকাও সাশ্রয় হচ্ছে।
সলেমান জানান, আমার বাড়ির সব কাজই এখন সৌরশক্তি নির্ভর। ওয়েল্ডিং মেশিনটাও সৌরশক্তিতে চলছে। মুরগি-গরুর খামার, হ্যাচারির ভারি ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতিও সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে চালাতে শুরু করেছি। মুরগির তিনটি শেডে এগজস্ট ফ্যান ও নয়টা সিলিং ফ্যান আর মাছের হ্যাচারির পানি তুলতেও ব্যবহৃত হচ্ছে এই শক্তি। বাড়ির ২০টির ওপরে লাইট, আটটি ফ্যান, ফ্রিজ, এসি, বৈদ্যুতিক চুলা, টেলিভিশনসহ সব ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতিও চলে সৌরশক্তিতে। যেখানে আগে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত, এখন তা নেমে এসেছে এক হাজার টাকার নিচে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন বলেন, উত্তরাঞ্চলে বোরো মৌসুমে লোডশেডিং তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। যার কারণে বোরো ধান উৎপাদনে সেচকাজে কৃষকদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
সলেমানের এই সৌর সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য এ উৎস ব্যবহারের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেচসুবিধা বাড়বে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা লাভবান হবে।