০৮ জুলাই, ২০২৬
হরমুজ প্রণালীর কাছে কাতার ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে।
এই হামলার পর মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) হরমুজে যাতায়াতের হুমকির মাত্রা ‘মারাত্মক’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বোঝাই কাতারি ট্যাংকার ‘আল রেকায়াত’-এর বাম পাশে আঘাত করা হয়েছে। হামলার পর এর ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং জাহাজটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঝুঁকিতে পড়ে। তবে নাবিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের কোনো জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটল। পাশাপাশি ওমান উপকূলের কাছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী ‘ওয়েদিয়ান’ নামের একটি সুপারট্যাঙ্কারও হামলার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ড্রোনের আঘাতে আরেকটি ট্যাংকার সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ইরানই এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে গুলি চালিয়েছে।
কাতার ও সৌদি আরব এই হামলার জন্য সরাসরি তেহরানকে দায়ী করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
এই সংঘাতের ফলে গত জুন মাস থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলা ভঙ্গুর সমঝোতাও ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে ইরানকে তেল বিক্রির জন্য দেওয়া বিশেষ লাইসেন্সটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার (৬ জুলাই) বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে আসবে, নতুবা সামরিক উপায়ে ‘কাজটা শেষ করে দিবে’। জুন মাসে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত হিসেবে ইরানকে কয়েক দশক পুরোনো নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তেল বিক্রির লাইসেন্স দিয়েছিল হোয়াইট হাউস।
কিন্তু মঙ্গলবারের (৭ জুলাই) হামলার পর সেই সুবিধা বাতিল করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের এই কার্যক্রম ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি অব্যাহত থাকলে কোনো ধরনের চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করা সম্ভব নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের সাথে সমন্বয় না করে চলাচল করে অথবা জাহাজের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রাখে, মূলত তারাই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে সরবরাহ করা হতো। মঙ্গলবারের হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে মাত্র ১৬টিতে নেমে এসেছে, যা গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে দৈনিক ১২৫টি জাহাজ চলাচল করত, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ২৫ থেকে ৪০টিতে। জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ট্যাঙ্কার বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে উপসাগরের অভ্যন্তরে একটি জাহাজে মালামাল বোঝাই করার দৈনিক গড় খরচ গত সপ্তাহের ২ লক্ষ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৩ লক্ষ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্ব তেল বাজার যেখানে ধারণা করেছিল যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে, সর্বশেষ এই হামলা সেই আশাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।