০৮ জুলাই, ২০২৬
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলের ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হতে যাচ্ছে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ অনুষদ। ইউরোপের কোনো সরকারি (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ইসলামি ধর্মতত্ত্বের স্বতন্ত্র অনুষদ চালুর এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জার্মানির ম্যুনস্টার শহরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়ন্স বা ধর্ম বিষয়ক ক্যাম্পাসের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মিলনায়তনে নতুন অনুষদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হলে ২০২৭ সালের মধ্যে সেখানে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ এবং ধর্ম বিষয়ে গবেষণার বিভাগগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কাজ শেষ হলে ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জার্মানি নয়, পুরো ইউরোপের প্রথম কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হবে, যেখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের জন্য পৃথক পূর্ণাঙ্গ অনুষদ থাকবে।
এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দেখছেন ইসলামি ধর্মতত্ত্ববিদ মুহানাদ খোরচিদে। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের একটি অনন্য অধ্যায়ের অংশ হতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।’
ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন ৫৪ বছর বয়সি মুহানাদ খোরচিদে। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি (জেডআইটি)-এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন তিনি নতুন প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, ‘এই অনুষদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চাই আমরা। ইসলামের মুক্তমনা ও আলোকিত দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে কথা বলতে চাই। নতুন এই অনুষদের কার্যক্রম শুধু ইউরোপেই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বেও প্রভাব ফেলতে পারে।’
পূর্ণাঙ্গ অনুষদের মর্যাদা পাওয়াকে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে জেডআইটির নিজস্ব অনুষদ মর্যাদা ছিল না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্য অনুষদের ওপর নির্ভর করতে হতো।
নতুন অনুষদ চালু হওয়ার ফলে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে ডক্টরেট এবং উচ্চতর একাডেমিক ডিগ্রি (হ্যাবিলিটেশন) দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের গবেষক ও শিক্ষাবিদ তৈরির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ঐতিহ্য গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০১২ সালে সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজির (জেডআইটি) যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র তিনজন কর্মী ও ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। বর্তমানে সেখানে আটজন অধ্যাপকসহ ৫০ জনের বেশি কর্মী রয়েছেন। আগামী কয়েক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন মুহানাদ খোরচিদে।
তিনি জানান, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। জার্মানির সরকারি স্কুলগুলোতে ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা চালু হওয়ায় যোগ্য ধর্মীয় শিক্ষকের চাহিদা বাড়ছে।
জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষকের চাহিদার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে প্রায় তিন হাজার ধর্মীয় শিক্ষকের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৩৩০ জনের মতো।’
২০২৭ সাল থেকে ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইসলাম ও সমাজকর্ম’ নামে একটি মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে যুবসেবা, হাসপাতালভিত্তিক ধর্মীয় পরামর্শদান (চ্যাপলেইনসি) এবং বয়স্কদের সেবার মতো ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রোবার্স বলেন, ‘ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। এখন একই ক্যাম্পাসে দুটি খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব অনুষদের পাশাপাশি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ যুক্ত হচ্ছে, যা প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘সেখানে গ্রন্থাগার ও ক্যাফেটেরিয়াসহ একটি সমন্বিত পরিবেশ তৈরি করা হবে, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে একাডেমিক আলোচনা ও গবেষণার সুযোগ থাকবে।’
উল্লেখ্য, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি অনুষদ রয়েছে। তবে সেটি কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর অংশ নয়। ফলে ম্যুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ ইউরোপের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জার্মানির সাবেক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ও মধ্য-ডানপন্থি দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) রাজনীতিবিদ আনেট শাভানও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এক নিবন্ধে লিখেছেন, ম্যুনস্টারের নতুন ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুষদ পুরো ইউরোপে স্বীকৃতি পাবে। তথ্যসূত্র: ডিডব্লিউ।