ভয়াবহ অনলাইন সিসা, পার্সেলে হুক্কা

১০ জুলাই, ২০২৬

রাজধানীর গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় একসময় সিসা লাউঞ্জ ছিল অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’। আলো-আঁধারির পরিবেশে তরুণ-তরুণীদের আড্ডার অন্যতম আকর্ষণ ছিল হুক্কা ও বিভিন্ন ফ্লেভারের সিসা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে এসব লাউঞ্জের কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে এলেও থেমে নেই সিসার ব্যবসা। বরং কৌশল বদলে এখন অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ারে পার্সেলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে লাখ টাকার হুক্কা ও বিভিন্ন ফ্লেভারের সিসা। সম্প্রতি দেশের ইতিহাসে এক অভিযানে সর্বোচ্চ ৬৬ কেজি সিসা ও ৪১টি হুক্কা জব্দ এবং অনলাইনভিত্তিক একটি চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা ও গুলশানের কালাচাঁদপুরে অভিযান চালিয়ে ইরানি বংশোদ্ভূত দুই যমজ ভাই এবং আরেক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দুটি চক্র ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দামের হুক্কা বিক্রি করত। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সিসার ফ্লেভারও সরবরাহ করত, যার কিছু ফ্লেভারের দামও প্রায় লাখ টাকা। তদন্তে জানা গেছে, এ পর্যন্ত তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী ও ফরিদপুরসহ ১৫টি জেলায় সিসা ও হুক্কা সরবরাহ করেছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ক্রেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জ ও পাঁচতারকা হোটেলেও নিয়মিত সরবরাহ দেওয়া হতো। ডিএনসি জব্দ করা মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে ৩ শতাধিক ক্রেতাকে শনাক্ত করেছে। তাদের মধ্যে অর্ধশত ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ভ্যানিলা, মিন্ট ও ডাবল অ্যাপেল ফ্লেভারের সিসা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেপ্তার তিনজন ছাড়াও চক্র দুটির আরও অন্তত পাঁচ সদস্য সক্রিয় রয়েছে। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। ডিএনসি জানায়, ইরানি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি যমজ সহোদর আহমেদ শরিফি ও মেহদাদ শরিফির বাবা ব্যবসার কাজে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজধানীর একটি মার্কেটে তাদের ব্যবসা রয়েছে। দুই ভাই নিয়মিত ইরান যাতায়াত করতেন। সেখান থেকে সিসার ব্যবসার ধারণা নিয়ে দেশে ফিরে অনলাইনে এ ব্যবসা শুরু করেন। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার মাকসুদ আলম বনানীর বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জে নিয়মিত যেতেন। সেখান থেকেই তিনি বাজারের চাহিদা বুঝে প্রথমে বিভিন্ন লাউঞ্জে এবং পরে অনলাইনে সিসা ও হুক্কা সরবরাহ শুরু করেন। তদন্তে আরও জানা গেছে, দুটি চক্রই দুবাই থেকে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে বিভিন্ন মডেলের হুক্কা দেশে এনে বাসায় মজুত রাখত। পরে অনলাইনে অর্ডার পেলে কুরিয়ারের মাধ্যমে পার্সেল করে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠানো হতো। এক চক্রের পণ্য শেষ হয়ে গেলে অন্য চক্র তাদের সহযোগিতা করত। ডিএনসি সূত্র জানায়, বিক্রির অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হলেও ব্যবহৃত হতো অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম। এতে মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত। তবে পার্সেল পাঠাতে আসা সদস্যদের সূত্র ধরেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় মামলা করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তকারীদের ধারণা, দুবাই থেকে হুক্কা সংগ্রহ, লাগেজ পার্টির মাধ্যমে দেশে আনা এবং বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) শামীম আহম্মেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘একসময় গুলশান ও বনানী এলাকায় সিসা লাউঞ্জ অনেকটাই ওপেন সিক্রেট ছিল। ডিএনসির ধারাবাহিক অভিযানে এখন সেসব কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ। ফলে অনেক ক্রেতা অনলাইনে ঝুঁকছেন। অন্যান্য মাদকের মতো অনলাইনভিত্তিক সিসা বিক্রিও বাড়ছে। এসব চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’

ভ্রান্ত ধারণায় বাড়ছে সিসার ব্যবহার : আইন অনুযায়ী, ০.২ শতাংশের বেশি নিকোটিনযুক্ত সিসা অবৈধ। ডিএনসির রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা কোনো নমুনাতেই ০.২ শতাংশের নিচে নিকোটিন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দেশে বিক্রি হওয়া সিসা কার্যত মাদক হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সিসা সেবনে ফুসফুস, মূত্রথলি ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। হৃদরোগের আশঙ্কাও বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। একই হুক্কা বা পাইপ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে যক্ষ্মা, হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া এবং কিডনি বিকলের আশঙ্কাও বেড়ে যায়। অথচ অনেকের মধ্যে এখনো ধারণা রয়েছে, সিসা তুলনামূলকভাবে ক্ষতিকর নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ভ্রান্ত ধারণাই দেশে সিসা ব্যবহারের বিস্তারের অন্যতম কারণ।