১৫ জুলাই, ২০২৬
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই চেতনার নবায়ন।”
বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম- সংবিধান সংস্কার, জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট, রাষ্ট্রপতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতি, দুর্নীতি এবং জুলাই গণহত্যার বিচারসহ নানা ইস্যুতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তার ভাষায়, ১৯৭১ সালে যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই আকাঙ্ক্ষাকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে।
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটি নিয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই। তবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানও বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিশেষ অধ্যায়।”
এনসিপির এই নেতা অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদের মূল সংস্কার প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যুক্ত করে ঐকমত্যের চেতনাকে দুর্বল করা হয়েছে। তার দাবি, রাজনৈতিক ঐকমত্যের পরিবর্তে দলীয় অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়ায় জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংবিধান প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনর্লিখন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি থেকে তাদের অবস্থান বদলায়নি। তিনি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ দ্রুত গঠন এবং গণভোটে গৃহীত সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে তাদের আপত্তি আগেও ছিল এবং এখনো রয়েছে। তিনি রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন অতীত ভূমিকার সমালোচনা করে তাকে অপসারণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে বক্তব্যে ঋণখেলাপি, ঋণ পুনঃতফসিল এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে অনেক ঋণখেলাপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, শুধু বিগত সরকারের নয়, অতীতের সব সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। তার মতে, এতে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বক্তব্যে এনসিপির এই নেতা বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পারস্পরিক মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারের অবস্থান জানতে চান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মাজারে হামলা এবং বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে এ বিষয়ে সরকারকে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করার আহ্বান জানান।
কৃষি কার্ড চালুর প্রশংসা করলেও কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম।
জুলাই গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারকে নিয়মিত সংসদ ও জনগণকে জানানো উচিত। পাশাপাশি শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং আরো বাড়ানোর আহ্বান জানান।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রেক্ষাপট ছিল চাকরির বৈষম্য। তাই তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিতে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।