২০ জুলাই, ২০২৬
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় আবাসিক, সিএনজি স্টেশন, শিল্প খাতসহ সব ক্ষেত্রেই এখন তীব্র গ্যাসের সংকট চলছে। রাজধানীর অনেক এলাকায় কোথাও একেবারেই গ্যাস নেই, আবার কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে দীর্ঘ সময় চুলা জ্বালিয়েও রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। একইসঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানবাহনের লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারছেন না চালকরা। ধুঁকছে শিল্পের উৎপাদনও।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে সিরামিক, ইস্পাত ও টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। এদিকে সাভারে ভুক্তভোগীরা গ্যাসের দাবিতে স্থানীয় আঞ্চলিক অফিস ঘেরাও করেছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলএনজির ঘাটতি, জরাজীর্ণ পাইপলাইনের লিকেজ এবং বৃষ্টির পানি পাইপলাইনে ঢুকে পড়ার কারণে আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর শেখেরটেক-২ নম্বর রোড পিসিকালচার হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা মাসুদ হাসান বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমাদের এলাকায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলা দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। এতে আমাদের রান্নার খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি ভোগান্তিও বাড়ছে। এমনকি স্বাভাবিক সময়েও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না।’
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘নির্ধারিত একটি এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে না পৌঁছানোয় গত দুই দিনে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দ অপরিবর্তিত রাখায় এই ঘাটতির পুরো চাপ শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি খাতে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক টানা ভারি বৃষ্টিতে অনেক স্থানে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের অদৃশ্য লিকেজ দিয়ে পানি ঢুকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। মাটির গভীরে থাকা পাইপলাইনের লিকেজ শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় স্থায়ী সমাধানও বিলম্বিত হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে বারবার সংস্কারের কারণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও অনেক ক্ষেত্রে লিকেজ শনাক্ত করা যাচ্ছে না।’
কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান আরো বলেন, ‘বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। গ্যাস সরবরাহ না বাড়লে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল ও বিপুলসংখ্যক আবাসিক গ্রাহক তিতাসের আওতায় থাকলেও বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকেই সবচেয়ে বেশি চাপ নিতে হয়।’
এদিকে গ্যাসের স্বল্পতায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ পাওয়ায় স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, ‘গ্যাসের প্রেসার এখন খুবই কম, যার কারণে যানবাহনে গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। গ্যাসসংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়ের কারণে সিএনজি স্টেশন পরিচালনা এখন অলাভজনক হয়ে পড়েছে। প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে মালিকদের মার্জিন মাত্র আট টাকা, যার মধ্যে প্রায় ছয় টাকাই বিদ্যুৎ ব্যয়ে চলে যায়। ফলে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে কর্মচারীদের বেতন ও পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।’
গত ছয় বছরেই দেশীয় গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন সাড়ে ২৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে প্রায় ১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। অন্যদিকে এই সময় বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে এই ঘাটতি পূরণে নিয়মিত স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করেও চাহিদা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশন, আবাসিক খাতসহ সব ক্ষেত্রেই এখন গ্যাসের সংকট চলছে। এর মধ্যে সিরামিক, ইস্পাত ও টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসসংকটে শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমেছে। কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানি আয় কমেছে। বিনিয়োগ থমকে আছে। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। তাই শিল্পের গ্যাস-বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো না গেলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমার পাশাপাশি রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে ডলারসংকট আরো তীব্র হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘সরকার বন্ধ কারখানাগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে চালুর কথা বলছে। কিন্তু যেসব কারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোই যদি গ্যাসসংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে শুধু অর্থায়নের মাধ্যমে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা সচল করা সম্ভব হবে না।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে সহায়তা দেওয়া, কেন সেগুলো সংকটে পড়ছে তা চিহ্নিত করা এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা। নতুন শিল্প বা নতুন বিনিয়োগের চেয়ে এই মুহূর্তে চলমান শিল্প-কারখানার সমস্যা সমাধানেই সরকারের বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
তিতাসের অফিস ঘেরাও
সাভারে দীর্ঘদিনের তীব্র গ্যাসসংকটে অতিষ্ঠ গ্রাহকরা গতকাল রবিবার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবিতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। পৌর এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে নারী-পুরুষসহ কয়েক শ গ্রাহক এতে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দুই মাস ধরে বাসাবাড়িতে গ্যাস প্রায় পাওয়াই যাচ্ছে না। ফলে রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই হোটেলের খাবার কিংবা লাকড়ির চুলা, ইন্ডাকশন ও বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও সেবা না পাওয়ায় তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, আগে রাতে কিছু সময় গ্যাস মিললেও বর্তমানে ২৪ ঘণ্টায় এক ঘণ্টাও গ্যাস থাকে না। তাঁরা অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, চোরাই গ্যাস ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সেবা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস বিল স্থগিতের দাবি জানান।
সূত্র : কালের কণ্ঠ