‘শুধু আবু সাঈদ বা মুগ্ধরাই কি শহীদ’— প্রশ্ন জুলাই শহীদ পরিবারের

২১ জুলাই, ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বজন হারানোর দুই বছর পরও অবহেলা, বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সংকটের অভিযোগ তুলেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি মিললেও অনেক পরিবার এখনো খোঁজখবর, পুনর্বাসন কিংবা ন্যায্য স্বীকৃতি পায়নি বলে দাবি তাদের। 

সোমবার (২০ জুলাই) বিকালে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম (এসডিএফ) আয়োজিত ‘জুলাইয়ের কান্না, জাতির দায়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধারা।  

একই সঙ্গে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আহতদের সুচিকিৎসা এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মনিরুল ইসলামের মেয়ে রুফাইদা ইসলাম চাঁদনী বলেন, ১৮ জুলাই আমার বাবা প্রথম আন্দোলনে গিয়েছিলেন। ১৯ জুলাইও সারা দিন আন্দোলনে ছিলেন। সেদিন মাগরিবের নামাজের পর বের হওয়ার পরই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমার বাবা মিরপুরে শহীদ হলেও আমাদের পরিবারের খোঁজ কেউ নেয়নি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কেউ না।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু আবু সাঈদ বা মুগ্ধরাই কি শহীদ? অন্য শহীদদের কি খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই? হয়তো প্রত্যেক জেলায় যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আমার বাবা তো মিরপুরেই শহীদ হয়েছেন। তবুও কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন। জুলাই সনদ ছাড়া আমাদের আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি নেই, কোনো পরিচয় নেই। পাশাপাশি জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার এবং শেখ হাসিনার বিচার চাই।

শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা মোছা. শাহিনা বেগম আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে বলেন, মৃত্যুর আগে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে ছেলে আমাকে বলেছিল, ‘আম্মু, আমি যদি শহীদ হই, তাহলে আমার আইডি কার্ড দেখে আমাকে শনাক্ত করবে।’ স্বৈরাচার সরকার আমার সন্তানকে পুড়িয়ে দিলেও আইডি কার্ডটি পুরোপুরি পুড়িয়ে দিতে পারেনি। সেই আইডি কার্ডের অংশ দিয়েই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তাকে নিয়ে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, তিনি জুলাইয়ের ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করবেন এবং শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু তিনি দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেছেন। আজও অনেক কবর শনাক্ত হয়নি, আহতদের গেজেট হয়নি। আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রেখে গেছেন। 

 

 

বর্তমান সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাড়ি-গাড়ি নয়, আমরা বিচার চাই। শেখ হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।

শহীদ রমিজ উদ্দীনের বাবা রকিবুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কেন হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে কাজে দেখাতে হবে। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে, বৈষম্য দূর করতে হবে, প্রত্যেক শহীদ হত্যার বিচার করতে হবে এবং জুলাই সনদকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।

মতবিনিময় সভায় আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই আন্দোলন ও শহীদদের হেয় করা কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পক্ষে জনমত তৈরির অপচেষ্টাকে আইন করে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত।

তিনি বলেন, শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করতে হবে। যেসব পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে হারিয়েছে, তাদের জন্য আজীবন সম্মানজনক পেনশন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।