ফরিদপুরের রাজপরিবারে জন্ম, কৈশোরে মুম্বাইয়ের বস্তিতে বাস— কে এই গায়িকা

২১ জুলাই, ২০২৬

ভারতীয় সংগীতের আকাশে আলোর দিশারী হয়ে এসেছিলেন সুরসম্রাজ্ঞী গীতা দত্ত। মাত্র চার দশকের জীবনে সুরের মায়ায় বেঁধেছিলেন কোটি ভক্তকে। পেয়েছিলেন খ্যাতি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন ছিল ভাঙাগড়ায় ভরা। দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করার জন্যও ছিল যেন বড্ড তাড়াহুড়ো। ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই মাত্র ৪১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। এ বছরই গায়িকাকে হারিয়ে ফেলার ৫৪ বছর হচ্ছে।

১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার ইদিলপুরে (বর্তমান বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট) এক জমিদার পরিবারে জন্ম নেন গীতা। জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ রায়চৌধুরী ও অমিয়া রায় চৌধুরীর দশ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। শৈশব থেকে তাঁর গলার সুর ছিল অসাধারণ, যা নজর এড়ায়নি বাবা-মায়ের। ওস্তাদ হরেন্দ্রনাথ নন্দীর কাছে তিনি সংগীতের প্রথম তালিম নেন। শৈশবে তাঁর জীবন কেটেছে রাজবাড়িতে। কিন্তু সুখের জীবনে ভাটা পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।

বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে ভেঙে পড়ে জমিদারি শাসন ব্যবস্থা। রাজ্য ছেড়ে কলকাতা হয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমায় গীতার পরিবার। ভারতে গিয়ে ঠাঁই মেলে বস্তি এলাকায়। অভাব-অনটনের মাঝেও গান ছাড়েননি কিশোরী গীতা। পরিবারের হাল ধরতে বারো বছর বয়স থেকে তিনি গান শেখানো শুরু করেন। বাসের ভাড়া বাঁচাতে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন।

একদিন বারান্দায় তাঁর গুনগুন গান শুনে থমকে দাঁড়ান সুরকার হনুমান প্রসাদ। তাঁর জহুরি চোখ ঠিকই চিনে নেয় গীতার প্রতিভাকে। ১৯৪৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। এরপর সংগীতপরিচালক শচীন দেব বর্মনের হাত ধরে ‘দো ভাই’ ছবির ‘মেরা সুন্দর সপনা বিত গ্যয়া’ গানের মাধ্যমে রাতারাতি তারকা বনে যান তিনি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তার পারদ তুঙ্গে পৌঁছায়।

সংগীত অঙ্গনে যখন নিজেকে একটু একটু করে প্রতিষ্ঠিত করছেন, ঠিক তখনই তাঁর জীবনে আসেন প্রখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক গুরু দত্ত। ১৯৫১ সালে ‘বাজি’ ছবির ‘তদবির সে বিগরি হুই তকদির বনা লে’ গানটি রেকর্ডিংয়ের সময় তরুণী গীতার গায়কিতে মুগ্ধ হন গুরু দত্ত। টানা তিন বছর সম্পর্কের পর ১৯৫৩ সালে বাঙালি মতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী হয়ে ওঠেন গীতা দত্ত।

বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে দাম্পত্য জীবনে তৈরি হয় নানা জটিলতা। বিয়ের পর গুরু দত্তের ব্যানারের বাইরে গান গাওয়ায় বিধিনিষেধের কারণে গীতার ক্যারিয়ারে স্থবিরতা নেমে আসে। পরবর্তীতে ‘সি.আই.ডি’ ছবির মাধ্যমে ওয়াহিদা রহমানের সাথে গুরু দত্তের সম্পর্কের গুঞ্জন ওঠে। স্বামীর পরকীয়ার জেরে বাপের বাড়িতে চলে যান গীতা। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে সম্পর্কের দূরত্ব।

সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে একের পর এক ছবি ফ্লপ হওয়ার হতাশায় ১৯৬৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছেদ না হলেও আলাদা থাকতে শুরু করেন গুরু ও গীতা। এর কিছুদিন পর মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে মারা যান গুরু। স্বামীর আকস্মিক প্রয়াণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন গীতা।

পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বেশ কিছু স্টেজ শো করেন। অর্থ জোগাড় করতে একটি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সংগীত ভুবনে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু প্রাণঘাতী লিভারজনিত রোগ তাঁকে আর সময় দেয়নি। জীবনের শেষ দিনগুলো তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কেটেছে কিংবদন্তি শিল্পীর। অল্প বয়সে বিদায় নিলেও তাঁর অনবদ্য সুরের জাদু আজও ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংগীতের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।