বিয়ের ৫ মাসের মাথায় নৃশংসভাবে খুন হলেন বিএনপি কর্মী পলাশ

২৩ জুলাই, ২০২৬

মাত্র পাঁচ মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ইব্রাহিম পলাশ। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা—সবকিছুই এগোচ্ছিল নিজের মতো করে। কয়েকদিন আগেই বড় বোনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে একটি মোটরসাইকেল কিনেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের সংসার টিকল না। রাজধানীর সবুজবাগে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিএনপির এই কর্মীকে। হত্যার পরও থামেনি বর্বরতা। দুর্বৃত্তরা তার দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন নিয়ে মরদেহ এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। অথচ হত্যাকাণ্ডের এত সময় পেরিয়ে গেলেও বিচ্ছিন্ন দুই হাতের কবজি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

গতকাল মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে সবুজবাগের রাজারবাগ বাজারের পানির পাম্প-সংলগ্ন একটি মুদি দোকানের সামনে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় পলাশকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পলাশের মাথা, ঘাড়, বুক, কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া তার ডান ও বাম হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

নিহত পলাশের বড় বোন জোসনা বেগম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমার বাসা থেকে আমার মেয়ে জান্নাতের জন্য খাবার নিয়ে বের হয়। আমার মেয়ে জামিয়াতুল সালেহা মহিলা মাদ্রাসায় পড়ে। সেখানে খাবার দিয়ে সে জানায়, কালীবাড়ি এলাকায় তার কিছু কাজ আছে, সেখানে যাবে। এরপর কিছুক্ষণ পর খবর পাই, কে বা কারা আমার ভাইকে কুপিয়ে ফেলে গেছে। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর আমার ভাই মারা যায়।’

কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘কী নৃশংসভাবে আমার ভাইকে হত্যা করেছে, আপনারা দেখেছেন। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার দুটি হাতও কেটে নিয়ে গেছে। আমার ভাই মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেছে। সংসারটাকে গুছিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু তারা আমার ভাইকে বাঁচতে দিল না। কয়েকদিন আগেই আমি তাকে এক লাখ টাকা দিয়েছি। সেই টাকা দিয়ে সে একটি মোটরসাইকেল কিনেছে। আমরা দুই ভাই ও দুই বোন। ভাইবোনের মধ্যে পলাশ ছিল তৃতীয়।’

নিহতের স্ত্রী মরিয়মের কান্না যেন থামছেই না। মাত্র পাঁচ মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তারা। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন দিনের পরিচয়ের পর আমাদের বিয়ে হয়। সংসার জীবন ভালোই চলছিল। ভালোবেসে বিয়ে করলাম, কিন্তু জীবনসঙ্গীকে নিয়ে সংসার করা হলো না। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। এই মাসেই আমার ফল প্রকাশ হওয়ার কথা। নৃশংসভাবে সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে এভাবে হত্যা করল। কোনোভাবেই আমরা এটা মেনে নিতে পারছি না। কে আমাকে ভালোবাসবে? আমার তো আর কিছুই রইল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন দুপুরে সে বাসায় এসে খাওয়া-দাওয়া করে। আমি একটি টিউশনি করাতাম। টিউশনির টাকা আনার জন্য তাকে কিছু না বলেই বাসা থেকে বের হই। পরে সে আমাকে একবার ফোন করেছিল, কিন্তু আমি টের পাইনি। বাসায় ফিরে তাকে একটি মেসেজ দেই—'আর কখনো এরকম হবে না, সরি, তোমাকে না বলে গেছি।' সে মেসেজটি দেখেছিল, কিন্তু কোনো উত্তর দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘রাত ৮টা থেকে সোয়া ৮টার মধ্যে বাসায় এসে একজন জানান, আপনারা কিছুই জানেন না? পলাশ ভাইকে তো কারা যেন কুপিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে গেছে।’ খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরে ঢাকা মেডিকেলে এসে মরিয়ম দেখেন, তার ভালোবাসার মানুষটি আর বেঁচে নেই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘নৃশংসভাবে তারা আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার দুটি হাতও কেটে নিয়ে গেছে।’

স্বামীর কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল কি না জানতে চাইলে মরিয়ম বলেন, ‘কার সঙ্গে রাজনীতি করত, বাইরে কী করত… এসব বিষয় আমি জিজ্ঞেস করতাম না। তবে কয়েকদিন আগে মোবাইল নিয়ে কিছু লোকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছিলাম। পরে বিষয়টি মীমাংসাও হয়ে যায়। কোথা থেকে, কী কারণে, কারা এই ঘটনাটি ঘটাল, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। অল্পদিন বিয়ে হয়েছে, তাই তার সব বিষয়ও এখনো জানা হয়ে ওঠেনি।’

এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ১৫ জুলাই একটি রিকশা গ্যারেজে কয়েকজন যুবক সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তির ওপর হামলা চালাচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, রিকশা গ্যারেজের ম্যানেজারের কাছে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে রয়েল, সবুজ ও শফিক ওই হামলা চালিয়েছিল।

পলাশকে হত্যার দিনের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজেও চাঞ্চল্যকর দৃশ্য ধরা পড়েছে। ফুটেজ অনুযায়ী, ২১ জুলাই রাত ৮টা ১০ মিনিটে স্থানীয় কয়েকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একজন হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র ‘সামুরাই’ নিয়ে দৌড়ে এসে একজনকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন। স্থানীয়দের দাবি, ওই ব্যক্তি স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত রয়েল। তিনি সামুরাই দিয়ে পলাশকে একের পর এক কোপাতে থাকেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, হামলার আগে রয়েলের সঙ্গে চলাফেরা করা কয়েকজন এসে পলাশকে দেখে যান। তারা চলে গিয়ে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দেওয়ার পরই রয়েল প্রকাশ্যে এসে হামলা চালিয়ে পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করেন।

হত্যাকাণ্ডের পর সন্ধ্যায় সবুজবাগের রাজারবাগ বাজারের পানির পাম্প-সংলগ্ন একটি মুদি দোকানের সামনে পলাশের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তার দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন ছিল। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল ইব্রাহিম পলাশ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং তার দুটি হাত কেটে নেওয়া হয়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।’

হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রয়েল নামে তার সঙ্গে চলাফেরা করা এক ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে ঝগড়া হয়। পরে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাতাহাতির একপর্যায়ে রয়েলের মায়ের গায়ে হাত লাগে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েলসহ বেশ কয়েকজন মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। সিসিটিভি ফুটেজে আমরা চারজনকে দেখতে পেয়েছি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’

পলাশের বিচ্ছিন্ন দুই হাতের কবজি উদ্ধার হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা তার দুটি হাত উদ্ধার করতে পারিনি।’

নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। মাত্র পাঁচ মাসের সংসার, বড় বোনের স্বপ্ন, পরিবারের আশা—সবকিছু এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। আর পলাশের বিচ্ছিন্ন দুই হাতের কবজি এখনো খুঁজে ফিরছে পুলিশ।