৩ হাজার বছর পেরিয়েও কেন মানুষের হৃদয়ে ‘দি ওডিসি’?

২৩ জুলাই, ২০২৬

ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা ‘দি ওডিসি’ মুক্তির পর আবারও আলোচনায় এসেছে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্যগুলোর একটি। প্রায় তিন হাজার বছর আগে লেখা এই গল্প আজও বই, নাটক, সিনেমা ও সাহিত্যে সমান জনপ্রিয়।

প্রশ্ন হলো, এত পুরনো একটি গল্প এখনো কেন মানুষের মন ছুঁয়ে যায়? সম্প্রতি দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।

কী এই ‘দি ওডিসি’?

‘দি ওডিসি’ প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের রচনা। ধারণা করা হয়, এটি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে লেখা হয়েছিল। এটি হোমারের দ্বিতীয় মহাকাব্য।

প্রথমটি ছিল ‘দি ইলিয়াড’।

‘ইলিয়াড’ যেখানে ট্রয় যুদ্ধের কাহিনি বলে, সেখানে ‘দ্য ওডিসি’ শুরু হয় সেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। যুদ্ধ জয়ের পরও কেন একজন বীর ১০ বছর ধরে ঘরে ফিরতে পারেননি—সেই গল্পই উঠে এসেছে এই মহাকাব্যে।

ট্রয় যুদ্ধ কেন হয়েছিল?

গ্রিক পুরাণে বলা হয়, স্পার্টার রাজা মেনেলাউসের স্ত্রী ছিলেন সুন্দরী হেলেন।

ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস তাকে ট্রয়ে নিয়ে যান। কেউ বলেন, তিনি অপহৃত হয়েছিলেন। আবার কেউ বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন।

এরপর মেনেলাউস অন্য গ্রিক রাজাদের সাহায্য চান। সেই ডাকে সাড়া দেন ওডিসিউসসহ অনেক বীর যোদ্ধা।

শুরু হয় দীর্ঘ ট্রয় যুদ্ধ, যা টানা ১০ বছর চলে। এই যুদ্ধের কাহিনি রয়েছে ‘দ্য ইলিয়াড’-এ।

ওডিসিউসের দীর্ঘ পথচলা

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওডিসিউস নিজের রাজ্য ইথাকায় ফিরতে চান। কিন্তু সেই পথ মোটেও সহজ ছিল না।

এক সময় তিনি একচোখা দানব পলিফেমাসকে অন্ধ করে পালিয়ে যান। পলিফেমাস ছিলেন সমুদ্রের দেবতা পোসেইডনের ছেলে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পোসেইডন ওডিসিউসকে অভিশাপ দেন। সেই অভিশাপের কারণেই তার ঘরে ফিরতে লেগে যায় আরও ১০ বছর।

এই দীর্ঘ যাত্রায় ওডিসিউসের সামনে আসে একের পর এক বিপদ। তিনি জাদুকরী সার্সির মুখোমুখি হন। ভয়ংকর সাইরেনদের মায়াবী গান থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। স্কিলা ও ক্যারিবডিস নামে দুই ভয়ংকর সমুদ্রদানবের মাঝ দিয়ে জাহাজ চালিয়ে যেতে হয় তাকে। আবার ক্যালিপসো নামে এক অপ্সরা তাকে অমরত্বের প্রলোভন দেখিয়ে নিজের কাছে আটকে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওডিসিউসের একটাই ইচ্ছা ছিল—নিজের পরিবার ও দেশে ফিরে যাওয়া।

ইথাকায় কী ঘটছিল?

ওডিসিউসের অনুপস্থিতিতে সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই।

তার স্ত্রী পেনেলোপিকে বিয়ে করতে শতাধিক পাত্র রাজপ্রাসাদে ভিড় জমায়। তারা রাজপরিবারের সম্পদও ভোগ করতে থাকে।

অন্যদিকে ছেলে টেলেমাকাস বাবার স্মৃতি নিয়েই বড় হয়। পরে সে বাবার খোঁজে বের হয়। আর পেনেলোপি বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে স্বামীর ফেরার অপেক্ষা করেন। এই অপেক্ষাই মহাকাব্যটিকে আরও আবেগময় করে তুলেছে।

শুধু যুদ্ধ নয়, এটি ঘরে ফেরার গল্প

'দ্য ইলিয়াড' যুদ্ধের বীরত্বের গল্প। কিন্তু 'দ্য ওডিসি' যুদ্ধের পর মানুষের জীবনের গল্প।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'নোস্তোস', যার অর্থ ঘরে ফেরা। ওডিসিউস যুদ্ধ জিতে নতুন রাজ্য চাননি। তিনি চেয়েছিলেন শুধু নিজের পরিবার, নিজের মানুষ আর নিজের ঘরে ফিরতে।

এই কারণেই হাজার বছর পরও গল্পটি মানুষের কাছে আপন মনে হয়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নতুন রূপ

'দ্য ওডিসি' শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের অনেক লেখক ও নির্মাতা এই গল্পকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন।

১৯২২ সালে আইরিশ লেখক জেমস জয়েস তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'ইউলিসিস'-এ ওডিসিউসের যাত্রাকে আধুনিক ডাবলিন শহরের এক দিনের গল্পে রূপ দেন।

২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া 'ও ব্রাদার, হোয়ার আর্ট দাউ?' সিনেমাতেও এই মহাকাব্যের ছায়া দেখা যায়।

২০১৭ সালে অনুবাদক এমিলি উইলসন প্রথম নারী হিসেবে 'দ্য ওডিসি'র ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। তার অনুবাদ নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে মহাকাব্যটিকে আরও সহজ করে তোলে।

এর এক বছর পর লেখক ম্যাডেলিন মিলার তাঁর উপন্যাস 'সার্সি'-তে ওডিসিউসের গল্পকে জাদুকরী সার্সির চোখ দিয়ে নতুনভাবে তুলে ধরেন।

আজও কেন এত জনপ্রিয়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘দি ওডিসি'র জনপ্রিয়তার কারণ এর চিরন্তন মানবিক গল্প।

আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা বা নানা কারণে নিজের ঘর ছাড়তে বাধ্য হন। অনেকেই দীর্ঘ সময় পর ফিরে এসে দেখেন, সবকিছু বদলে গেছে।

ওডিসিউসের গল্পও সেই অভিজ্ঞতার কথা বলে। দীর্ঘ যাত্রা শুধু মানুষকে বদলে দেয় না, বদলে দেয় তার ঘর, পরিবার এবং চারপাশকেও।

নোলানের হাত ধরে নতুন প্রজন্মের সামনে

হলিউড নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান এবার এই প্রাচীন মহাকাব্যকে বড় পর্দায় নতুনভাবে তুলে এনেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, আইম্যাক্স নির্মাণশৈলী এবং তারকাবহুল অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো গল্পকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

শেষকথা

'দ্য ওডিসি' শুধু একজন বীর যোদ্ধার গল্প নয়। এটি পরিবার, ভালোবাসা, ধৈর্য, হারিয়ে যাওয়া, ফিরে আসা এবং নিজের জায়গা খুঁজে পাওয়ার গল্প।

তাই সময় বদলালেও এই মহাকাব্যের আবেদন কমেনি। প্রায় তিন হাজার বছর পরও 'দি ওডিসি' আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রাও শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের ঘরেই ফিরতে শেখায়।