আমেরিকায় কি প্রভাব হারাচ্ছেন নেতানিয়াহু?

২৯ জুলাই, ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নিজের অপরিহার্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর বোঝাপড়া ব্যবহার করে তিনি একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিজের এবং ইসরায়েলের সমর্থনে পাশে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। একপর্যায়ে মনে হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পই হয়তো অতীতের যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগত, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রকে যুক্ত করার পর। তবে ইরানের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধ থমকে যাওয়া, ইসরায়েলকে না জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চুক্তি তৈরিতে ট্রাম্পের আগ্রহ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সমালোচনার পটভূমিতে এখন ইসরায়েলে প্রশ্ন উঠছে যে নেতানিয়াহুর এই প্রভাবশালী ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি তার আগের কার্যকারিতা হারাচ্ছে?

এমন এক সময়ে এই সংশয় তৈরি হয়েছে যখন নেতানিয়াহু দেশে আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে কঠিন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চলছে দুর্নীতির মামলা। সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে এসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন নেতানিয়াহু, যা ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের প্রথম বৈঠক। এই সফরকে নেতানিয়াহুর জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ এবং ইসরায়েলি জনগণের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের নিবিড় সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরার মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধের সূচনা থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে শুরু করে। খোদ আমেরিকান মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মিশনের সম্ভাব্যতা এবং এর মাধ্যমে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন নেতানিয়াহুই। তাছাড়া ইসরায়েলে ক্রমবর্ধমান উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা প্রশ্রয় দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের এক সিনেটরকে অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি ও সৌদি আরবের সঙ্গে মার্কিন পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

নিউইয়র্কে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল আলন পিনকাস এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরের মূল কারণ একেবারেই স্বার্থপর। তিনি দাবি করেছেন যে তিনি তার দৃশ্যত মহান বন্ধু প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। দৃশ্যত একটি এজেন্ডা আছে, দৃশ্যত তারা ইরান, এফ-৩৫ এবং সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি দুটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ: প্রথমত, ইসরায়েলের ভেতরের মিত্র ও সমালোচকদের কাছে এই বার্তা দেওয়া যে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক এখনও টিকিয়ে রাখা গেছে; আর দ্বিতীয়ত, এই আশা করা যে ট্রাম্প আবারও দুর্নীতি মামলায় তার ক্ষমার আবেদন করবেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। আমেরিকার উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি যেমন পডকাস্টার টাকার কার্লসন এবং সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারজোরি টেলর গ্রিনও নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করছেন। এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জোজো রোগানের পডকাস্টে এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইসরায়েলি সরকারের ভেতরের কিছু ব্যক্তি ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য তার মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিটি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

চলতি সফর চলাকালে বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে এক সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রিতে নেতানিয়াহুর আপত্তি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমরা কী বিক্রি করব তা আমাকে কেউ বলে দেওয়ার অধিকার রাখে না।

কিংস কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র টিচিং ফেলো এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক অহ রন ব্রেগম্যান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে বলেন, নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে ওয়াশিংটনে এসেছেন যখন ট্রাম্পের চারপাশের অনেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিষাক্ত হয়ে উঠেছেন। সঠিক হোক বা ভুল, যুক্তরাষ্ট্রে তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে যিনি ট্রাম্পকে এমন এক স্বেচ্ছাকৃত যুদ্ধে টেনে এনেছেন যা কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পসহ কেউ তাকে আর ঘরের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি হিসেবে ভান করতে দেবে না। সেই দিন শেষ।

যদিও প্রকাশ্যে এই সফরে দৃশ্যমান কোনো মতভেদের চিহ্ন দেখানো হবে না, তবুও মার্কিন সম্পর্ককে নিজের একক নিয়ন্ত্রণে রাখার যে দাবি নেতানিয়াহু আসন্ন নির্বাচনে তুলতে চান, তা কতটা জোরালো হবে তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। ১৯৯০-এর দশকে নেতানিয়াহুর সাবেক সহকারী ও ইসরায়েলি জনমত বিশেষজ্ঞ মিচেল বারাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর দুর্দান্ত একটি ট্র্যাক রেকর্ড ছিল কিন্তু তিনি অনেক সেতু পুড়িয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন এফ-৩৫ বিক্রি, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের কাছে বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের মাধ্যমে এবং ইরান যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহুর প্রতি মার্কিন সমালোচনায় আমরা উত্তাপ লক্ষ্য করেছি, তাই ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর পক্ষে আর দীর্ঘ সময় সমর্থন জোগাবেন সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ট্রাম্প হয়তো খুব সহজেই নেতানিয়াহুকে একজন দুর্দান্ত যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন এবং অন্যান্য ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানানোর আগে বলতে পারেন যে ইসরায়েলের এখন এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

আল জাজিরা বিশ্লেষণ