ভারতে পাঁচ বছরে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে ৩০০ শতাংশ

২৯ জুলাই, ২০২৬

ভারতে সর্বোচ্চ স্তরের আয়করদাতাদের সংখ্যা নজিরবিহীন দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর নির্ধারণী বছর (অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার) ২০২৫-২৬-এ দেশটিতে বছরে অন্তত ১০০ কোটি রুপি বা তার বেশি আয় প্রকাশকারী ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৬ জনে। গত সোমবার (২৭ জুলাই) দেশটির লোকসভায় প্রদত্ত এক লিখিত জবাবে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছে। 

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে এই পর্যায়ের অতি-ধনী বা উচ্চ আয়ের করদাতার সংখ্যা ৩০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ধনকুবেরদের প্রভাব বৃদ্ধির এক বিরল রূপরেখা প্রকাশ করে।

ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী পার্লামেন্টে এক প্রশ্নের জবাবে জানান যে, বিগত কর নির্ধারণী বছর ২০২৪-২৫-এ বার্ষিক অন্তত ১০০ কোটি রুপি আয়কারীর সংখ্যা ছিল ৪১৫ জন। সেখান থেকে এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা উল্লেখজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭৬ জনে পৌঁছেছে। ঠিক পাঁচ বছর আগে, অর্থাৎ কর নির্ধারণী বছর ২০২১-২২-এ মাত্র ১৪২ জন করদাতা তাদের বার্ষিক আয় ১০০ কোটি রুপি বা তার বেশি বলে রিটার্নে দেখিয়েছিলেন। গত পাঁচ বছরের খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সংখ্যাটি পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১-২২ বছরে ১৪২ জন থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ বছরে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩০১ জনে। তবে ২০২৩-২৪ কর নির্ধারণী বছরে সাময়িকভাবে খানিকটা হ্রাস পেয়ে তা দাঁড়ায় ২৮৪ জনে। এরপরের বছরই অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে পুনরুত্থান ঘটে তা ৪১৫ জনে পৌঁছায় এবং সবশেষ ২০২৫-২৬ বছরে রেকর্ড ৫৭৬ জনে গিয়ে ঠেকে।

পার্লামেন্টে ধনকুবেরদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয় যে, আয়কর-সংক্রান্ত আইনে ‘বিলিয়নেয়ার’ বা ধনকুবেরের কোনো দাফরিক বা বিধিবদ্ধ সংজ্ঞা নেই। আয়কর আইন ২০২৫ কিংবা তৎকালীন আয়কর আইন ১৯৬১—কোনোটাতেই এই শব্দটির আইনি ব্যাখ্যা রাখা হয়নি। তাই কেন্দ্রীয় সরকার বার্ষিক ১০০ কোটি রুপি বা তার বেশি আয় প্রদর্শনকারী ব্যক্তিদেরই দেশের সর্বোচ্চ আয়কারী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে এই হিসাব প্রস্তুত করেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় ধনকুবেরদের মোট সম্পদের পরিমাণ বা গত পাঁচ বছরে তাদের সম্পদ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সরকারের কাছে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ প্রতিমন্ত্রী জানান যে, এমন কোনো দাফতরিক ডেটা বা তথ্য সরকার সংরক্ষণ করে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ‘ওয়েলথ-ট্যাক্স অ্যাক্ট, ১৯৫৭’ বা সম্পত্তি কর আইনটি বিলুপ্ত করা হয়েছে, যার ফলে করদাতাদের মোট পুঞ্জীভূত সম্পদের কোনো কেন্দ্রীয় হিসাব এখন আর রাখা হয় না।

দেশটিতে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্কিত উদ্বেগের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় পৃথক কোনো বিশেষ সমীক্ষার কথা না জানিয়ে বর্তমান গৃহস্থালি ভোগ ব্যয় জরিপের (এইচসিইএস) ২০২৩-২৪ তথ্য প্রকাশ করেছে। আয়কর ডেটার সঙ্গে এই জরিপ উদ্ধৃত করে প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানান, অর্থনীতিতে বৈষম্য পরিমাপক সামাজিক সূচক ‘গিনি কোফিসিয়েন্ট’ বা গিনি গুণাঙ্ক অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকায় বৈষম্য ০.২৬৬ থেকে কমে ০.২৩৭-এ নেমে এসেছে এবং শহরাঞ্চলে তা ০.৩১৪ থেকে হ্রাস পেয়ে ০.২৮৪ হয়েছে, যা গ্রামীণ ও শহর উভয় অঞ্চলেই ভোগের বৈষম্য কমে আসার ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া শ্রমবাজারের তথ্যের দিকে নির্দেশ করে সরকার জানায় যে, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ২০২২ সালের ৩.৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩.১ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে নীতি আয়োগের প্রাক্কলন উদ্ধৃত করে মন্ত্রণালয় জানায়, ২০১৩-১৪ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ২৪ কোটি ৮২ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যসীমা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, আয় ও সম্পদের বৈষম্য মোকাবিলায় কর ব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচির একটি যৌথ ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভারতের অগ্রগতিশীল আয়কর কাঠামো অনুযায়ী অতি-উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর স্বাভাবিক আয়করের অতিরিক্ত হিসেবে বাড়তি ‘সারচার্জ’ আরোপ করা হয়। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্টার্টআপ, সমবায় এবং অবকাঠামোগত খাতে বিশেষ করছাড় দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা, পিএম-কিসান, আয়ুষ্মান ভারত এবং জল জীবন মিশনের মতো ফ্ল্যাগশিপ সামাজিক নিরাপত্তামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যদিও এই আয়কর রিটার্নের তথ্য ভারতের অতি-উচ্চ আয়ের ধনকুবের গোষ্ঠীর চিত্রকে কিছুটা দৃশ্যমান করেছে, তবে পুঞ্জীভূত সম্পদের সরকারি তথ্যের অভাবে দেশটির সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণের প্রকৃত মাত্রা কতটা বিস্তৃত, তা এখনো অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে