পদক শেষ, স্মৃতির শুরু

০৩ আগস্ট, ২০২৬

বিশ্ব মাইল রেকর্ডধারী জশ কের যখন স্কটস্টাউন স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে ঐতিহাসিকভাবে ফিরিয়ে আনা কমনওয়েলথ মাইল জিতলেন, তখন গ্যালারির গর্জনে যেন কেঁপে উঠেছিল পুরো স্টেডিয়াম। স্বাগতিকের সেই জয় ছিল নিজের শহরের সামনে নিজের গল্প লিখে ফেলার মুহূর্ত।

গ্লাসগো এই গেমসকে মনে রাখবে কেরের জন্য। শুধু কের নন, এই এগারো দিনে অসংখ্য অ্যাথলেট মিলেই লিখেছেন গ্লাসগোর কাব্য। ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের তিন হাজারের বেশি অ্যাথলেট অংশ নিয়েছিলেন। ১০টি খেলা ও ছয়টি প্যারা খেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ২১৫টি পদক ইভেন্ট। বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৬৮টি পদক, যার মধ্যে ১৪১টি ছিল প্যারা ইভেন্টে।

সংখ্যাগুলো বড়। তার চেয়েও বড়, এই সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো।

স্বাগতিক স্কটল্যান্ডের আরেক নায়ক ডানকান স্কট। ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মেডলেতে স্বর্ণ জিতেন। জিমন্যাস্ট রুবেন ওয়ার্ড অলরাউন্ডে স্বর্ণ জিতে দর্শকদের আবেগে ভাসিয়েছেন।

প্যারা খেলাতেও স্কটল্যান্ড পেয়েছে নিজেদের নায়ক। বেন স্যান্ডিল্যান্ডস টি-২০ বিভাগের ১,৫০০ মিটারে স্বর্ণ জিতেছেন। আর মেলানি উডস টি-৫৪ বিভাগের ৪০০ ও ১,৫০০ মিটারে জোড়া স্বর্ণ এনে দিয়েছেন।

সাঁতারের জলে অন্য এক ঝড় তুলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মেগ হ্যারিস। একাই জিতেছেন ছয়টি স্বর্ণপদক। গেমসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সাফল্য।দক্ষিণ আফ্রিকার চ্যাড লে ক্লোস আবারও নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসে। পদকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১টি। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এত পদক আর কারও নেই।

চমকও ছিল কম নয়। নেটবলে চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে জ্যামাইকা ফাইনালে উঠে যায়। থ্রি-অন-থ্রি বাস্কেটবলেও দর্শক পেয়েছেন সিনেমার মতো নাটকীয়তা। শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য শটে স্কটল্যান্ডের কাইল জিমেনেজ দলকে সেমিফাইনালে তুলে দেন।

অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাকেও ইতিহাস লেখা হয়েছে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পুরুষদের ১০০ মিটারে ক্যামেরুনের ইমানুয়েল এসেমে ৯.৮৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে এমন এক দৌড় উপহার দেন, যা পুরো গেমসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

প্যারা পাওয়ারলিফটিংয়ে নাইজেরিয়ার ফোলাশাদে ওলুওয়াফেমিয়ায়ো ১৭৫ কেজি বেঞ্চ প্রেস করে ভেঙেছেন বিশ্বরেকর্ড।

এই গেমস প্যারা ক্রীড়ারও নতুন সংজ্ঞা লিখেছে। ৪৭টি স্বর্ণপদক দেওয়া হয়েছে প্যারা খেলায়। থমাস ইয়াং, সোফি হানদের পাশাপাশি ইতিহাস গড়েছে ভারতও। ভারতের প্যারা দল জিতেছে সাতটি পদক।যা কমনওয়েলথ গেমসে তাদের সর্বকালের সেরা সাফল্য। ভারতের আরেক গর্ব মীরাবাই চানু। নারীদের ৪৮ কেজি ভারোত্তোলনে তিনটি রেকর্ড গড়ে এনে দিয়েছেন দেশের প্রথম স্বর্ণপদক। জুডোতেও ইতিহাস লিখেছেন অসমিতা দে। ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষ করে ভারতের প্রথম কমনওয়েলথ জুডো স্বর্ণ জিতেছেন তিনি। পরে হর্ষ সিং পুরুষদের ৬০ কেজিতে স্বর্ণ জিতে ভারতের আনন্দ দ্বিগুণ করেন।

অস্ট্রেলিয়ার রোজ ডেভিস প্রথম অস্ট্রেলীয় নারী হিসেবে ১০ হাজার মিটারে কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়ন হন। পরে ৫ হাজার মিটারেও স্বর্ণ জিতে নিজের নাম লিখিয়েছেন সোনালি অক্ষরে।

ডমিনিকার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন থেয়া লাফন্ড নারীদের ট্রিপল জাম্পে দেশের ইতিহাসে প্রথম কমনওয়েলথ স্বর্ণ জেতেন। ওয়েলসের এমা ফিনুকেন স্প্রিন্টে গেমস রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জেতেন।

আবার এই গেমস জন্ম দিয়েছে নতুন ইতিহাসও। উগান্ডার হুসনাহ কুকুন্দাকওয়ে দেশের প্রথম সাঁতার ও প্রথম প্যারা পদক জিতেছেন। রুয়ান্ডার ফ্লোরেন্স নিয়োনকুরু এনে দিয়েছেন দেশের প্রথম সিনিয়র কমনওয়েলথ পদক।

শেষ পর্যন্ত পদক তালিকার শীর্ষে ছিল অস্ট্রেলিয়া। এখানে ছোট দেশের অ্যাথলেটও ব্যক্তিগত সেরা সময় করলে গ্যালারি দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছে। প্যারা অ্যাথলেটদের জয়কে একই আবেগে উদযাপন করেছে মানুষ। প্রতিপক্ষের জার্সি বদল হয়েছে বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে।

এটি মানুষের গল্প। একটি শহরের গল্প।

আর সেই গল্পের শেষ পাতায় গ্লাসগো শুধু একটি বাক্য লিখলো।ধন্যবাদ। আবার দেখা হবে, অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো ট্র্যাকে, নতুন কিছু স্বপ্ন নিয়ে।