সেউতার রাস্তায় ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগান, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি

০৩ আগস্ট, ২০২৬

মাত্র কয়েক দিন আগের অভিবাসী ঢলের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি সেউতা। তার মধ্যেই রবিবার রাতে ফের উত্তেজনা ছড়াল স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহলে।মরক্কো থেকে আসা একদল অভিবাসীর মিছিল ঘিরে স্প্যানিশ পুলিশের সঙ্গে বচসা ও ধস্তাধস্তি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মিছিলের কয়েকজনের মুখে ধর্মীয় স্লোগান শোনা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী।

ঘটনাটি ঘটে এমন এক সময়ে, যখন কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে সেউতায় ঢুকে পড়ার নজিরবিহীন ঘটনায় এখনও আতঙ্কে রয়েছে শহরটি। স্পেন সরকার জানিয়েছে, অধিকাংশ মানুষকে ইতিমধ্যেই মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে বা তাঁরা স্বেচ্ছায় ফিরে গিয়েছেন। কিন্তু সীমান্ত নিরাপত্তা, স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক চাপ এখনও বহাল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সেউতার রাস্তায় একটি বড় দল মিছিল করে এগিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন স্লোগান দিতে থাকেন। তা ঘিরেই পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা ছড়ায়। পরে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে পুলিশ ও মিছিলকারীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির দৃশ্য দেখা যায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে৷

তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়েছে এবং কোনও বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয় ঘটেনি। স্পেনের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সেউতা?

আফ্রিকা মহাদেশের উপকূলে অবস্থিত হলেও সেউতা স্পেনের অংশ, ফলে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে মরক্কো। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হয়ে উঠেছে সেউতা।

গত কয়েক সপ্তাহে এই ছোট শহরই ইউরোপের অভিবাসন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়ায় স্থানীয় প্রশাসন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ অভিযোগ করেছেন, মানবপাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য এই বিপুল ঢলের পেছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে। অনেক অভিবাসী বিশ্বাস করেছিলেন, সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছতে পারলে সহজেই ইউরোপে থাকার সুযোগ মিলবে।

তবে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি আদালতের একটি রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এমন ধারণা ছড়ানো হয়েছিল যে সমুদ্রপথে প্রবেশ করলে দ্রুত ফেরত পাঠানো যাবে না। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে পাচারকারীরা।

সেউতায় প্রবেশের চেষ্টার সময় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সমুদ্র পেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টায় অন্তত কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর খবর এসেছে। অনেকে ফিরে এসে জানিয়েছেন, তাঁরা ইউরোপে নতুন জীবনের আশায় রওনা হলেও বাস্তবে অপেক্ষা করছিল ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অনাহার।

ফিরে আসা অভিবাসীদের অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও দেখে উৎসাহিত হয়েছিলেন। সেখানে ইউরোপে পৌঁছানোর সহজ পথের কথা বলা হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।

ঘটনার পর স্পেন সরকার সীমান্তে সেনা ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে। সেউতার সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং মরক্কোর সঙ্গে সমন্বয় করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই ঘটনাকে দেশের ভূখণ্ডের ওপর গুরুতর চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর সরকার জানিয়েছে, একদিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হবে, অন্যদিকে মানবিক দায়িত্বও পালন করা হবে।

ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ

সেউতার ঘটনা শুধু স্পেনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতির নতুন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সীমান্ত নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। ইতালিও স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চলাচল নিয়ে নতুন পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সেউতার সংকট দেখিয়ে দিয়েছে অভিবাসন এখন শুধু মানবিক বিষয় নয়, এটি কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

বিপুল সংখ্যক মানুষ ফিরে গেলেও সেউতার বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় রয়ে গিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটতে পারে। শহরের কৌশলগত অবস্থান এবং ইউরোপে প্রবেশের আকর্ষণ ভবিষ্যতেও এই অঞ্চলকে চাপের মুখে রাখবে।

একটি ছোট সীমান্ত শহরের এই সংকট এখন ইউরোপের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, মানবিক দায়িত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা যাবে?