মোটা টাকায় কেনা আয়ারল্যান্ডের এয়ার ফোর্স ওয়ানে বড় গলদ

০৫ আগস্ট, ২০২৬

প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে নতুন একটি ড্যাসাল্ট ফ্যালকন সিক্সএক্স সরকারি জেট ক্রয় করেছে আয়ারল্যান্ড সরকার ।মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমানের আদলে এটিকেও বলা হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ । প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ সরকারি প্রতিনিধিদের দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রীয় সফরে ব্যবহারের জন্য কেনা এই অত্যাধুনিক বিমানটিকে ঘিরে দেশটিতে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিতর্কের মূল কারণ, বিমানটিতে ঘন কুয়াশা ও কম দৃশ্যমান আবহাওয়ায় নিরাপদ অবতরণে সহায়ক ‘ফ্যালকন আই কম্বাইড ভিশন সিস্টেম’ সংযোজন করা হয়নি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর নিরাপত্তা, সরকারি ক্রয়নীতি এবং আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যালকন আই প্রযুক্তিটি বিমানের নাকের অংশে স্থাপন করা হয় এবং কুয়াশা, ভারী বৃষ্টি বা অন্য যেকোনো কম দৃশ্যমান আবহাওয়ায় নিরাপদ অবতরণে পাইলটকে সহায়তা করে। ড্যাসাল্ট এভিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি উন্নত কম্বাইড ভিশন সিস্টেম (সিভিএস), যা ফরাসি বিমান নির্মাতা ড্যাসাল্ট এভিয়েশন এবং ইসরায়েলভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস যৌথভাবে তৈরি করেছে।

এই প্রযুক্তি বাস্তব সময়ের উন্নত ভিডিও এনহান্সড ভিশন সিস্টেম (ইভিএস) এবং ডাটাবেজভিত্তিক কৃত্রিম ভূ-মানচিত্র সিনথেটিক ভিশন সিস্টেম (এসভিএস) একত্রিত করে কুয়াশা, তুষারপাত, ভারী বৃষ্টি বা অন্ধকারের কারণে দৃশ্যমানতা যখন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসে তখন সেই পরিস্থিতিতেও পাইলটকে রানওয়ে ও আশপাশের পরিবেশ স্পষ্টভাবে দেখতে সহায়তা করে।

প্রযুক্তিটি না থাকার কারণেই নতুন সরকারি জেটকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়ারল্যান্ডের সরকারি ক্রয়নীতির কারণে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের এই প্রযুক্তি বিমানটিতে সংযোজন করা হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন ২০২৪ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে বলেছিলেন, আয়ারল্যান্ড সরকার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে নতুন ক্রয়চুক্তিতে যাবে না। গাজা যুদ্ধের পর আয়ারল্যান্ড ও ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই নীতি আরও আলোচনায় আসে।

বিষয়টি সামনে আসার পর বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের যুক্তি, আয়ারল্যান্ডের আবহাওয়া প্রায়ই কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। বিশেষ করে কর্ক বিমানবন্দরে বছরে গড়ে প্রায় ৯৯ দিন কুয়াশা দেখা যায়। এমন একটি দেশে রাষ্ট্রীয় ভিভিআইপি বিমান কেনার সময় কুয়াশায় অবতরণে সহায়ক উন্নত প্রযুক্তি বাদ দেওয়া নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ সিদ্ধান্ত ছিল না। তাদের মতে, ফ্যালকন আই প্রযুক্তি থাকলে প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও বিমান নিরাপদে অবতরণ করতে পারত এবং বিকল্প বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে এড়ানো সম্ভব হতো।

আইরিশ এয়ার কর্পসের (আইএসি) সাবেক পাইলট কেভিন ফিপস স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ফ্যালকন আই এমন একটি প্রযুক্তি যা অন্য বিমানকে আবহাওয়ার কারণে বিকল্প বিমানবন্দরে যেতে সহযোগীতা করে এবং সেখানে নিরাপদে অবতরণের সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম।

তবে ডাবলিনের প্রতিরক্ষা বিভাগ এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, নতুন ড্যাসাল্ট ফ্যালকন সিক্সএক্স এর পরিচালন সক্ষমতায় বর্তমানে কোনো কার্যকর সীমাবদ্ধতা নেই। বিমানটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান পূরণ করে এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সরকারি দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ উপযোগী। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ফ্যালকন আই না থাকলেও বিমানটির বিদ্যমান যন্ত্রপাতি নিরাপদ ও কার্যকর পরিচালনার জন্য যথেষ্ট।

নতুন সরকারি জেটটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আয়ারল্যান্ডে সরবরাহ করা হয়। এতে ১৪ জন যাত্রী বহনের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি সরকারের দীর্ঘদিন ব্যবহৃত লেয়ারজেটের পরিবর্তে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে বিমানটি পরিচালনা করছে আইরিশ এয়ার কর্পস (আইএসি)।

বিতর্কের আরেকটি দিক হলো, সরকার ইসরায়েলি প্রযুক্তি এড়িয়ে চলার নীতি অনুসরণ করলেও বাস্তবে আইরিশ বিমানবাহিনীর কিছু প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েলি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আইরিশ এয়ার কর্পসের চারটি হেলিকপ্টারে এলবিট সিস্টেমস ও এয়ারবাস যৌথভাবে তৈরি ফ্লাইট সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা, ওই প্রযুক্তিগুলোর কার্যকর বিকল্প তখন সহজলভ্য ছিল না এবং হেলিকপ্টারগুলো ওই প্রযুক্তি ছাড়া নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া আয়ারল্যান্ডের একটি সামুদ্রিক টহল বিমানে ইসরায়েলে তৈরি একটি রাডার সিস্টেমও ব্যবহৃত হচ্ছে।

এদিকে নতুন সরকারি জেটকে ঘিরে বিতর্ক আরও গুরুত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য আয়ারল্যান্ড সফরকে কেন্দ্র করে। আগামী সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প আয়ারল্যান্ড সফরে এসে ডাবলিনে সরকারি বৈঠকের পাশাপাশি কাউন্টি ক্লেয়ারের ডুনবেগে অবস্থিত তাঁর গলফ রিসোর্টে অনুষ্ঠিত আইরিশ ওপেন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য এই সফরকে সামনে রেখে আইরিশ সরকার, পুলিশ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে। সফরের সময় বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আকাশপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে অতিরিক্ত নজরদারির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

যদিও নতুন ফ্যালকন সিক্সএক্স জেটটি ট্রাম্পকে বহনের জন্য নয় এবং তাঁর সফরের সঙ্গে বিমানটি কেনার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই, তবুও পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি সফর এবং  উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের সময় সরকারি বিমানবহরের সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ট্রাম্পের মতো উচ্চপ্রোফাইল বিশ্বনেতার সফরের আগে আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে জনগণের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারি জেটকে ঘিরে বিতর্কটি কেবল একটি বিমান কেনার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নয়, এটি আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি, সরকারি ক্রয়নীতি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের মধ্যকার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে সরকার গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত করার নীতি অনুসরণ করছে, অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে কার্যকারিতা ও নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সরকার অবশ্য দাবি করছে, নতুন ড্যাসাল্ট ফ্যালকন সিক্সএক্স আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক সরকারি বিমান এবং ফ্যালকন আই প্রযুক্তি না থাকলেও এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ সক্ষম। তবে বিরোধীদের মতে, আয়ারল্যান্ডের আবহাওয়ার বাস্তবতায় কুয়াশায় নিরাপদ অবতরণের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফলে নতুন সরকারি জেটকে ঘিরে বিতর্ক আগামী দিনগুলোতেও দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন এবং জনপরিসরে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।