এলসি খুলতে না পারায় কাঁচামাল সংকট, বাধ্য হয়ে ১১ কারখানা বন্ধ

০৭ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রামভিত্তিক দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ তাদের শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। গ্রুপটির একের পর এক উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হওয়ায় হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত এবং শিল্পাঞ্চলে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে গ্রুপটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত হওয়া এবং ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারার কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় চট্টগ্রামের ১১টি কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও দীর্ঘসময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিবৃতিতে এস আলম গ্রুপ জানায়, ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকে বিদ্যুৎ, ব্যাংক, বীমা, চিনি, ভোজ্যতেল, ইস্পাত, সিমেন্ট, পরিবহন ও আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কোনো খেলাপি ঋণ ছিল না এবং গ্রাহক আস্থার ভিত্তিতেই ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে।

তবে গত দুই বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত, ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত হওয়া এবং এলসি খোলায় জটিলতার কারণে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে শিল্পগোষ্ঠীটি। এমন পরিস্থিতিতেও উৎপাদন না থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, শিল্প ও কর্মসংস্থানকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। বিদ্যমান বাধা দূর হলে এবং ব্যাংকিং সুবিধা পুনরায় চালু হলে দ্রুততম সময়ে সব কারখানার উৎপাদন চালু করা সম্ভব হবে।

এদিকে কারখানা বন্ধের ঘোষণার পর হাজারো শ্রমিকের মধ্যে চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকরা জানান, উৎপাদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। তারা দ্রুত কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

চট্টগ্রামের একজন শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় উৎপাদনের বাইরে থাকলে এর প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই সমস্যার দ্রুত সমাধান জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা বলছেন, একদিকে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানও সচল রাখতে হবে। এজন্য সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা প্রয়োজন।

অপরদিকে, এস আলম গ্রুপ তাদের বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের প্রতি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের অন্যতম বড় এই শিল্পগোষ্ঠীর ১১টি কারখানা বন্ধ থাকায় এর প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কর্মসংস্থান, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। এখন নজর সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগই পারে এই সংকট কাটিয়ে শিল্পের চাকা আবার সচল করতে।