বেহাল গাজীপুর সাফারি পার্ক, কমছে দর্শনার্থী

১১ আগস্ট, ২০২৬

‘রাস্তা ভাঙাচোরা। অনেক স্থানে বড় বড় গর্ত।

গর্তে গাড়ির বডি রাস্তার সঙ্গে লেগে যায়। ভাঙা রাস্তায় হেলেদুলে ঝাঁকুনি খেতে খেতে চলে গাড়ি। গাড়ির এসিও নষ্ট। গরমে-ঘামে একাকার যাত্রীরা।

বাঘ-সিংহ ও ভাল্লুকের বেষ্টনীও জরাজীর্ণ। প্রাণীগুলোর অবস্থা আরো করুণ।’ শুক্রবার দুপুরে গাজীপুর সাফারি পার্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘আফ্রিকান কোর সাফারি’ ঘুরে দেখে এসব কথা বলেন স্বামী-সন্তান নিয়ে নরসিংদীর শিবপুর থেকে আসা দর্শনার্থী গৃহবধূ নাজনীন আখতার। তাঁর কথায় ছিল স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।

হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কোর সাফারিতে এখন জিরাফ নেই। অথচ জিরাফ শিশুদের খুবই পছন্দের। বাঘগুলো দেখে মনে হয়েছে, ওরা খুবই দুর্বল। তিনটি সিংহকে অলসভাবে ঘুমাতে দেখা গেছে। বাঘ-সিংহের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত জিরাফের ব্যবস্থা করতে হবে।

গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নষ্ট এসি দ্রুত মেরামত করতে হবে।’

কিংডম সাফারিরও করুণ দশা। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার দুটি বন্ধ। ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে আসা দর্শনার্থী ব্যবসায়ী আকমল হোসেন জানান, পরিবার নিয়ে চার-পাঁচ বছর আগেও এসেছিলেন। তখন জমজমাট ছিল। এবার এসে পুরোই হতাশ হয়েছেন। ফেন্সি কার্প গার্ডেন, এগ ওয়ার্ল্ড, হাতি শো গ্যালারি, অডিটরিয়াম, পার্কের ভেতরে থাকা তিন ফুড কোর্ট বন্ধ। লেকের পানিতে ভাসত নানা ধরনের রঙিন মাছ। এখন মাছ নেই, পানিও ঘোলা। লেকের প্যাডল বোটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। জুলাই গণ-অভ্যুধানের পর হামলায় তছনছ হওয়া শিশু পার্কটিও অচল। অথচ শিশুদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল এটি। বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের যাতায়াতের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই। লায়ন ও টাইগার নামের দুটি রেস্টুরেন্ট ছিল। ক্ষুধা লাগলে বাঘ ও সিংহ দেখতে দেখতে রেস্টুরেন্ট দুটিতে বসে খাওয়া যেত। রেস্টুরেন্ট দুটিও বন্ধ। সব মিলিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ পার্কটি।

জানা গেছে, শালবনের বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, চিত্তবিনোদন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আহত বন্য প্রাণীর সেবা ও হাসপাতাল স্থাপন এবং সারা দেশে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৩ সালের শেষের দিকে গাজীপুরের শ্রীপুরে তিন হাজার ৬৯০ একর জমিতে গড়ে তোলা হয় পার্কটি। শুরুতে এর নাম ছিল ‘গাজীপুর বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক’। এখানে প্রাণীদের দুই ভাগে আলাদা করে রাখা হয়। একটি ভাগ ‘আফ্রিকান কোর সাফারি’ এবং অন্যটি ‘কিংডম সাফারি’ নামে পরিচিত। কোর সাফারিতে বাঘ, সিংহ, ভালুক, জিরাফ, হরিণ, জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, নীলগাইসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী বনের মধ্যে উন্মুক্ত অবস্থায় রাখা হয়। দর্শনার্থীরা সুরক্ষিত গাড়িতে বসে ঘুরে প্রাণীদের দেখে। আর কিংডম সাফারিতে নিরীহ বন্য প্রাণীদের বড় বেষ্টনীতে আটকে রেখে প্রদর্শন করা হয়। শুরুতে ব্যাপক দর্শনার্থীর আগমন ঘটতে থাকে সাফারি পার্কে। বাড়তে থাকে আয়। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে প্রাণীর মৃত্যু, দুর্লভ প্রাণী চুরি ও অব্যবস্থানায় ডুবতে থাকে পার্কটি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে হামলার শিকার হয় সাফারি পার্কটি। পরে নাম পাল্টে রাখা হয় ‘গাজীপুর সাফারি পার্ক’।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় হাতি, ময়ূর, ম্যাকাউ, প্যারট, জেব্রা, হরিণ, নীলগাই, গয়াল বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি করা হয়েছে বেশ কয়েকটি যাত্রীছাউনি, বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। শৃঙ্খলা ফেরায় বেড়েছে রাজস্ব আদায়ও।

সাফারি পার্কের সামনের একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী বলেন, আগে সাফারি পার্কের গেট প্রতিবছর ভ্যাট-ট্যাক্সসহ তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি, কোর সাফারি দেড় থেকে দুই কোটি, পাখিশালা ৯০ থেকে ৯৫ লাখ এবং টাইগার ও লায়ন রেস্টুরেন্ট ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকায় ইজারা হতো। ২০২২ সালের পর প্রাণীর মৃত্যু, প্রাণী চুরি ও পাচার, প্রাণীর খাদ্যে অনিয়ম, চিকিৎসায় গাফিলতি এবং নানা দুর্নীতির কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে।

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী বন সংরক্ষক তারেক রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্কের কয়েক কিলোমিটার সীমানাপ্রাচীর অরক্ষিত। চোর ঢুকে মালপত্র চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। জনবলের তীব্র সংকট। নিরাপত্তা প্রহরী নেই। ১০টি গাড়ির মধ্যে তিনটি অকেজো। তিনটি লক্কড়ঝক্কড়, এসি নষ্ট। কিছুদিন আগে উন্নতমানের দুটি গাড়ি কেনা হয়েছে। রাস্তা খারাপ থাকায় সেগুলো চালানো যাচ্ছে না। আরো কমপক্ষে চারটি গাড়ির প্রয়োজন। জিরাফ আনার বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। সিংহ ও বাঘগুলোর বয়স এবং শরীরে চর্বি জমায় তাদের প্রজনন ঘটছে না। তাই নতুন করে বাঘ ও সিংহ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই নতুন বাঘ আনা হচ্ছে। শেড না থাকায় দুটি চিতাবাঘ থাকলেও প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। ভালুক রয়েছে ২১টি। পার্কটিকে দর্শকপ্রিয় করে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে বন বিভাগ।’