১৭ আগস্ট, ২০২৬
প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষক সংকট থেকে বের হতে পারেনি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি)। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার মান, গবেষণা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রতি ৩৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত হওয়া উচিত ১:২০। সেই হিসাবে এই মানদণ্ড থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে পাবিপ্রবি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাবিপ্রবির ২১টি বিভাগে মোট ২১৩ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও এর মধ্যে ৫৫ জন বর্তমানে শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। ফলে, কার্যত ১৫৮ জন শিক্ষক দিয়ে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে একজন শিক্ষককে একাধিক কোর্স, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও গবেষণার চাপ একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিভাগভিত্তিক শিক্ষকসংখ্যার চিত্রও উদ্বেগজনক। সবচেয়ে কম শিক্ষক রয়েছেন সমাজকর্ম বিভাগে। সেখানে মাত্র চারজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এরপর নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। ছয়জন শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান, বাংলা, পরিসংখ্যান, লোক প্রশাসন, ইতিহাস, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিএইচএম) এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। ফার্মেসি ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে সাতজন করে শিক্ষক রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক বিভাগেই নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, ল্যাব পরিচালনা ও গবেষণা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক সময় ক্লাস দেরিতে শুরু হয় বা একই শিক্ষককে একাধিক ব্যাচ সামলাতে হয়। ফলে প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং লোড ক্যালকুলেশন নীতিমালা অনুযায়ী, একজন শিক্ষকের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা হবে ৪০ ঘণ্টা। এই কর্মঘণ্টা কন্টাক্ট আওয়ার ও নন-কন্টাক্ট আওয়ার সমন্বয়ে পরিপূর্ণ হবে। ৪০ ঘণ্টার মধ্যে একজন শিক্ষক গড়ে ১৩ ঘণ্টা কন্টাক্ট আওয়ারে ব্যয় করবেন। তবে, বিভাগপ্রধানের সাপ্তাহিক কন্টাক্ট আওয়ার হবে ছয় ঘণ্টা। কিন্তু, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকায় কর্মরত শিক্ষকদের ওপর বাড়তি পড়ানোর চাপ পড়ছে।
শিক্ষকরা বলছেন, দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের ফিরে আসা নিশ্চিত করা না গেলে সংকট আরো তীব্র হতে পারে। একইসঙ্গে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি না করলে দক্ষ শিক্ষক আকর্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জাহিদুর ইসলাম বলেন, “শিক্ষক সংকট থাকার ফলে আমাদের অনেক প্রেসারের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। একটি বিভাগের যখন মাত্র ৪ জন শিক্ষক থাকে তখন কোন উপায় থাকে না। আমরা একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সব ব্যাচের ক্লাস পরিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করি যা একদম অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রশাসনের কাছে জানানো হয়েছে কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়নি।”
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আশরাফুজ্জামান প্রামাণিক বলেন, “ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ হওয়া স্বত্বেও আমাদের টিচার সংকটের কারণে অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষক নিয়ে আসতে হচ্ছে বিভিন্ন কোর্স কাভার করার জন্য। বিভিন্ন সময় দেখা যায়, তারা আবার ওই সময়ে কোর্সটি নিতে পারবেন না। ডিপার্টমেন্টের কোর্স তাদের দিয়েই করাতে হয়। সংকট কাটানোর জন্য বাইরে থেকে শিক্ষক খন্ডকালীন নিয়ে কোর্স শেষ করতে হয়। শুরু থেকেই আমাদের শিক্ষক সংকট ছিল কোনমতে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিয়ে কোর্সগুলো সম্পর্ণ করতে একপ্রকার চাপের উপর দিয়েই যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে নিজেরাই ভাগ করে নিয়ে সব শেষ করতে হচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম বলেন, “যতগুলো নিয়োগ হওয়া প্রয়োজন তা উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। আগের দেওয়া বিজ্ঞাপনগুলোর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। আর নতুন করে কোন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হবে।”