২১ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার চাঞ্চল্যকর অভিযোগে লাইবেরিয়ার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলরের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অর্থ পাচারসহ একাধিক গুরুতর অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, গত বুধবার রাজধানী মনরোভিয়ার রবার্টস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য একটি ফ্লাইটে ওঠার ঠিক মুহূর্তেই ৬৩ বছর বয়সী এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদের পথরোধ করে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩১৭ মিলিয়ন ডলার (২৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের বিশাল কোকেন চালানের ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশপ্রধান গ্রিগরি কোলম্যান সরাসরি এই সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম যুক্ত করেন, যা লাইবেরিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা অঙ্গনে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
এখন পর্যন্ত এই গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি ৬৩ বছর বয়সী জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলর।
তবে এ নিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি যোগাযোগ করলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ পেশ না করা পর্যন্ত তিনি বা তার মক্কেল কোনো মন্তব্য করবেন না।
জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বেশ ঘটনাবহুল। লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং সাবেক বিদ্রোহী নেতা চার্লস টেইলরের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চার্লস টেইলর ক্ষমতায় ছিলেন।
পরবর্তীতে প্রতিবেশী সিয়েরা লিওনে ১৯৯১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে—যেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল—বিদ্রোহীদের সহায়তার দায়ে জাতিসংঘ সমর্থিত একটি আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেন। এরপর সময়ের পরিক্রমায় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ উইয়ার অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জুয়েল।
বর্তমানে লাইবেরীয় পুলিশের পক্ষ থেকে জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলরের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন নিয়ন্ত্রিত মাদক আমদানি, বিক্রি, পরিবহন, অবৈধ পাচার এবং অপরাধমূলক প্ররোচনা ও সহায়তার মতো কঠোর আইনি ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকায় পুলিশ তিনজন বিদেশি নাগরিক—যার মধ্যে দুইজন ক্রোয়েশিয়ান এবং একজন ইউক্রেনীয়—তাদের অনুপস্থিতিতেই (ইন অ্যাবসেন্সিয়া) অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেছে।
এই চক্রটি একটি বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করছিল বলে তদন্তকারীরা দাবি করেছেন।
দেশটির আইনমন্ত্রী অসওয়াল্ড টুয়েহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, পলাতক ওই তিন বিদেশি নাগরিককে খুঁজে বের করতে এবং গ্রেফতারের আওতায় আনতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া হবে।
গত জুন ও জুলাই মাসে লাইবেরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুটি সফল অভিযানের পর দেশজুড়ে কোকেন চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে জুলাই মাসের অভিযানে প্রায় চার টন কোকেন উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩১৭ মিলিয়ন ডলার এবং এই চালানটি ইউরোপের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মাদক জবরদখল হিসেবে আখ্যা দেয় এবং এর পেছনে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত রয়েছে বলে শনাক্ত করে।
প্রাথমিক তদন্তের সূত্র ধরে এই মামলার জল এখন লাইবেরিয়া নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের দফতর পর্যন্ত গড়িয়েছে, যার ফলে একে একে বের হয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চলমান এই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কেবল মাদক পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তি বা বহিরাগতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে থাকা অর্থজোগানদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা এই অপকর্মকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
এক সরকারি বিবৃতিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, কোনো পদই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কোনো রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বা প্রভাব এখানে কার্যকর হবে না, কোনো জাতীয়তা কাউকে আইনি ছাড় দেবে না এবং কোনো ব্যক্তিই আইনের নাগালের বাইরে নয়।
ব্যক্তিই আইনের নাগালের বাইরে নয়। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে কোকেন পাচারের ক্ষেত্রে পশ্চিম আফ্রিকাকে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সুবিধাজনক ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা, যার পেছনে এই অঞ্চলের দুর্বল সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুর্বল আইনি ব্যবস্থার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।