১৫ বছর ধরে ঘরবন্দী ৬৫ বছরের সালেহা, ভাঙা ঘরেই একাকী জীবন

২৫ আগস্ট, ২০২৬

স্বামীর মৃত্যুর পর যেন থমকে গেছে সালেহা বেগমের জীবন। প্রায় ১৫ বছর ধরে জরাজীর্ণ একটি ঘরের মধ্যেই কাটছে তার দিন-রাত। নেই বিদ্যুৎ, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগেও তাকে ঘরের বাইরে বের হতে দেখেননি স্থানীয়রা। এমনকি গোসল ও মলমূত্র ত্যাগের জন্যও তিনি বাইরে বের হন না।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের নাচনাপাড়া এলাকায় আন্দারমানিক নদীর পাড়ে কাপড় ও পলিথিনে ঘেরা হেলে পড়া ঘরটিই যেন ৬৫ বছর বয়সী সালেহা বেগমের একমাত্র পৃথিবী। ঘরের চারপাশে নোংরা পানি, দুর্গন্ধ। বিষধর সাপ ও পোকামাকড়ের আনাগোনাও রয়েছে। এরপরও অজানা কারণে বছরের পর বছর এই ঘর আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি।

স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কী কারণে প্রায় দেড় যুগ ধরে নিজেকে এভাবে ঘরবন্দী করে রেখেছেন সালেহা। জীবনে এমন কী ঘটেছিল, যার পর থেকে মানুষের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন—এর সঠিক উত্তর জানা যায়নি।

প্রতিবেশীরা জানান, সালেহা বেগম যে ঘরে থাকেন, সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো জায়গাও নেই। চারপাশে নোংরা পানি ও দুর্গন্ধ। তাঁর মেয়ে লাকি বেগম নিয়মিত মায়ের জন্য খাবার নিয়ে যান। তবে মায়ের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা হয় না। কখনো কখনো ইচ্ছা না হলে খাবারও গ্রহণ করেন না সালেহা।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, কিডনি ও লিভারের জটিলতায় আক্রান্ত একমাত্র অসুস্থ ছেলেকেও দেখতে বাইরে আসেননি তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সালেহা বেগমের স্বামী আবুল কালাম আনসার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সালেহা অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। একসময় ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন ওই জরাজীর্ণ ঘরে। এরপর মানুষের সঙ্গেও কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দেন।

প্রতিবেশী বিউটি বেগম বলেন, ‘ঘরের চারপাশে সব সময় পানি জমে থাকে। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ এই ঘরের ভেতরেও সাপ দেখা গেছে। একজন বয়স্ক নারীকে এভাবে অনিরাপদ ঘরে একা রাখা খুবই উদ্বেগের বিষয়। তাকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই সফল হতে পারিনি।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা সালেহা বেগমকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখে আসছেন। তাকে ঘরের বাইরে বের হতে দেখা যায় না। যে ঘরে তিনি থাকেন, সেটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবিক দিক বিবেচনায় দ্রুত তার জন্য নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

এদিকে সালেহা বেগমের দুর্দশার খবর পেয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোকছেদুল আলম তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সরেজমিনে সালেহার ঘর পরিদর্শন করে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন।

সালেহার মেয়ে লাকি বেগম বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আমি মায়ের মুখ দেখিনি। মা এখন একটি জরাজীর্ণ ঘরে একা থাকেন। আমার একমাত্র ভাইও অসুস্থ। সংসারের ভরণপোষণের জন্য আমাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়। অভাবের মধ্যেও পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর চেষ্টা করছি।’

প্রতিবেশীরা জানান , লাকি বেগমের এক ভাই কিডনি ও লিভারের জটিলতায় ভুগছেন। পাশাপাশি তার এক বোনও মানসিকভাবে অসুস্থ। সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম অসহায়ত্বের মধ্যে রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোকছেদুল আলম বলেন, ‘সালেহা বেগমের বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। তার বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই অত্যন্ত মানবিক ও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তার আওতায় তাকে নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য একটি ঘর দেওয়া যায় কি না, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’