২৭ আগস্ট, ২০২৬
আকাশ মেঘলা ছিল না, ছিল না কোনো বৃষ্টির আনাগোনা। তা সত্ত্বেও তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক এক হিমধসের ধাক্কায় নেপালে নেমে এসেছে ভয়াবহ জলউচ্ছ্বাস। উজান থেকে ধেয়ে আসা এই অস্বাভাবিক প্লাবনে নেপালের তিনটি জেলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। খবর দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের।
দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, এখনো প্রায় ৪০০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশী পর্যটক এবং ৪৪ জন নেপালী নিরাপত্তা কর্মী। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নেপালের ইতিহাসে এটি অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের রসুওয়াগধি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে তিব্বতের লেন্দে নদীতে এই বিশাল হিমধস আঘাত হানে। জমে থাকা বরফ ও ধ্বংসাবশেষে নদীটির গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে তৈরি হয় কৃত্রিম বাঁধ। পরবর্তীতে সেই বাঁধ ভেঙে গিয়ে তাসের ঘরের মতো ভেসে যায় লোকালয়।
স্থানীয়রা যখন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই উজান থেকে ১০০ মিটার উঁচু এক দানবীয় পানির দেয়াল ধেয়ে আসে। তিমুরে বাজার এলাকা চোখের পলকে বিলীন হয়ে যায় এবং কাস্টমস পয়েন্টে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ও গাড়ি স্রোতে তলিয়ে যায়।
ভোটকোশী ও ত্রিশূলী নদীর গতিপথ ধরে এগিয়ে চলা এই ক্ষিপ্র স্রোত পুরো এলাকায় মারাত্মক ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। রসুওয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার ঘরবাড়ি, বাজার, ৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, একাধিক ব্যাংক শাখা, ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার হাইওয়ে সড়ক এক লহমায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
নুওয়াকোটের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোল থেকে আক্করে বাজার পর্যন্ত বিশাল এলাকা এখন কেবল কাদা ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বহু গ্রামে কোনো ঘরবাড়ির অস্তিত্বই আর চোখে পড়ছে না।
এই ট্র্যাজেডি হিমালয় অঞ্চলে সীমান্ত পেরিয়ে আসা বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থার দৈন্যকে প্রকাশ করেছে। ২০১৯ সালে দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল ও চীনের চুক্তি হলেও, তিব্বতে নদী আটকে থাকার কোনো বার্তা নেপাল প্রশাসন সময়মতো পায়নি। আবার নেপালের তৈরি নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ যন্ত্রগুলোও প্লাবনের তোড়ে ভেসে যায়। ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সামান্যতম সুযোগও পাননি।
যদিও সকালে পানির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নুওয়াকোটসহ ভাটির এলাকাগুলোতে চার মিনিটের মধ্যে জরুরি বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল—যার ফলে বেশ কিছু মানুষ উঁচুতে উঠে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন; কিন্তু রসুওয়া জেলায় কোনো সতর্কবার্তাই সময়মতো পৌঁছায়নি। ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর চলতি এই দুর্যোগকে নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।