২৮ আগস্ট, ২০২৬
বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি এমন একসময় সরকার গঠন করে যখন বাংলাদেশ পথহারা, বিপন্ন, আশাহীন। দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর, সমাজ অস্থির, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নির্বাসিত, জনগণ অধিকারহীন। কোথাও কোনো সুখবর ছিল না। বিগত ১৫ বছরে অগণতান্ত্রিক সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট আর দলীয়করণ দেশের অর্থনীতিই শুধু ধ্বংস হয়নি, আইনের শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে। বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ করে নষ্ট করা হয়েছিল। মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছিল। ভোটারবিহীন নির্বাচন, রাতের ভোট এবং আমি-ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে তামাশা করা হয়েছিল।
মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষমতাবানের কাছে জিম্মি হয়ে ছিল গোটা দেশের জনগণ। এ অবস্থার প্রতিবাদ করতে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলনে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ। ২০২৪-এর জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে দেশের ছাত্রসমাজ। এ আন্দোলনের সঙ্গে মানুষের ভোটাধিকার, মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকার যুক্ত করে বিএনপি। ছাত্রদের আন্দোলন তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের।
দেশের জনগণ আশা করেছিল আওয়ামী লীগের পতনের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশে প্রাণভরে শ্বাস নেবে এ দেশের মানুষ। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন তাঁরা স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। সরকারি চাকুরেরা ধারণা করেছিলেন এবার মেধা আর যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন হবে। শিক্ষকরা স্বপ্ন দেখেছিলেন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসবে। দলবাজিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা আলোকিত হবে। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল ভয়হীন সমাজে তারা বসবাস করবে। কিন্তু দেশের মানুষের আশাভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি।
৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেড়টা বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিভীষিকাময় কালো অধ্যায়। এ সময় দেশ অন্ধকার থেকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
ইউনূস সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নামে অর্থনীতি ধ্বংসের আয়োজন করেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করেন। মব বাহিনী শিল্পকারখানায় নির্বিচারে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। সরকার দূর থেকে তামাশা দেখতে থাকে। শিল্পকারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ইউনূস শাসনামলে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা হতাশায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাই নিরাপদ মনে করেন। বন্ধ হয়ে যায় বহু কারখানা, নতুন করে বেকার হয় দেড় কোটি মানুষ। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় আরও ২ কোটি মানুষ। ১৮ মাসে ড. ইউনূস দেশের অর্থনীতি ফোকলা করে ফেলেছেন। দেড় কোটি বেকার আর ২ কোটি চরম দরিদ্র মানুষ সৃষ্টি করেছেন। বিনিয়োগ বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ, অর্থনীতি অচল।
১৮ মাসে দেশের শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছেন, দেশের শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। কথায় কথায় মারামারি, ক্লাস বন্ধ, অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীরা ক্লাস না করে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করেছে।
গত ১৮ মাসে গণমাধ্যমে এক আতঙ্ক পরিবেশ বিরাজ করছে। মবের শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে বহু সাংবাদিককে। ১৮ মাসে ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ছিল হতাশার চিত্র। রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে খেলাধুলা মুক্ত রাখতে পারেনি অন্তর্র্বর্তী সরকার। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ১৮ মাসে বিশ্বের দরজা বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের জন্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ইউনূসের আমলে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল মব সন্ত্রাস। মবের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ।
ইউনূসের আমলে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বলেছেন ঘুষের রেট বেড়েছে। হাতে গোনা দু-একজন উপদেষ্টা ছাড়া সবার বিরুদ্ধেই উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ।
এই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সারা বিশ্বে। তেলের দাম বৃদ্ধি পায় হুহু করে। বিশ্ব অর্থনীতিতে জমা হয় মন্দার কালো মেঘ। অতীতের ক্ষত এবং বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ এখন এক গভীর সংকটে। একদিকে তীব্র লোডশেডিং, অন্যদিকে গ্যাসসংকটে অচল প্রায় শিল্পকারখানা। দেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার এখন এমন এক সংকটে যার জন্য এ সরকার মোটেও দায়ী নয়। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার দেশ পুনর্গঠনে কাজ করছে।
এখন এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। সব পক্ষের সরকারকে সংকট উত্তরণে সহযোগিতা করা। এখন সমালোচনার সময় নয়, এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ পুনরুদ্ধারে লড়াই করার সময়। যেকোনো মূল্যে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।
মাত্র ছয় মাস সময়ে সবকিছু স্বাভাবিক করা অসম্ভব। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার শুরু থেকে দেশকে ঠিক পথে আনার চেষ্টা করছে। বিএনপি কতটা সফল বা ব্যর্থ তা মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। তবে লাইনচ্যুত দেশকে সঠিক লাইনে আনার জন্য বিএনপি যে চেষ্টা করছে তা দেশের মানুষ ঠিকই উপলব্ধি করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি প্রাণবন্ত সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবারের যারা জাতীয় সংসদে এসেছেন তারা সবাই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা। এ সংসদের প্রতিটি সংসদ সদস্যই বিগত ১৭ বছর গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং জনগণের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। জেলজুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি দল ও সদস্য জানেন গণতন্ত্র কত মূল্যবান। কত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই গণতন্ত্র এবং জাতীয় সংসদ। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এবং কিছু সুশীল সমাজের সদস্য সরকারের বিরুদ্ধে এখনই নানারকম হুমকি দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন- এ সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া যাবে না। সুশীল সমাজের যারা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছিলেন যারা এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা এখন আবার সরব হয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে তারা দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। এসব দেশের জন্য কখনোই ইতিবাচক ফল আনবে না। এখন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার সময়। অর্থনীতিকে সচল করার সময়। মব সন্ত্রাস বন্ধ করার সময়। শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সময়। বিরোধী দল সংসদে অবশ্যই সরকারের সমালোচনা করবে। সরকারের ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেবে। পাশাপাশি দেশ রক্ষায়, জাতীয় প্রশ্নে, অর্থনীতি বাঁচাতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করবে- এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা। সরকারের সবকিছুর সমালোচনা করাই শুধু বিরোধী দলের কাজ নয়। বিরোধী দলের কাজ সরকারকে পথ দেখানোও। শেষ পর্যন্ত দেশটা আমাদের সবার। সুশীল সমাজের উচিত, সরকারকে সুপরামর্শ দেওয়া। শুধু পাি ত্য দেখানোর জন্য সরকারের সমালোচনা করার সময় এখন নয়।
পাশাপাশি সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের স্বার্থে সবার সঙ্গে কথা বলা। বিরোধী দল, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে সরকারকে। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করছেন। এই পাঁচ মাসে তিনি ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার একটি চমৎকার সংস্কৃতি তিনি চালু করেছেন। সবাইকে প্রধানমন্ত্রী তিনটি বিষয়ে অনুরোধ করেছেন। প্রথমত, সরকার একটি কঠিন সময়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। দেশ পুনর্গঠনে তিনি সময় চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন। তৃতীয়ত, তিনি সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। যেকোনো সরকারের সফলতার পেছনে সরকারপ্রধানের এ ধরনের দায়বদ্ধতা অত্যন্ত ইতিবাচক। জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে কাজেই আমরা যা খুশি তাই করব- এই মানসিকতা কোনোভাবেই সরকারের মাথায় নেই। এখন পর্যন্ত সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে। তবে এই কথা বলার পরিধি আরও বাড়ানো উচিত। এখন পর্যন্ত সরকারপ্রধান যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তারা বেশির ভাগই বিএনপি ঘরানার। যারা বিএনপি করে না এমনকি যারা বিএনপির সমালোচক তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দরজা খোলা রাখা দরকার। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নিজস্ব দলীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বললে তা চাটুকারিতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হতে পারে। সেটা সরকারকে ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন করতে পারে। তাই দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা এবং দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমেই গণতন্ত্র বিকশিত হবে, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।