২৮ আগস্ট, ২০২৬
ইরানের সঙ্গে জুন মাসে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা (এমওইউ) পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহ হারিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরিবর্তে তিনি কঠোর অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানকে আরও অনুকূল শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে চান বলে জানিয়েছে সূত্র।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) টাইমস অব ইসরাইলকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে নতুন নিষেধাজ্ঞার চাপ ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করবে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আলোচনা চলছে না। এমনকি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন, তা ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন খাতকে লক্ষ্য করে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের যেসব প্রতিষ্ঠান ইরানি তেল পরিবহনে জড়িত, তারাও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানান, জুনের সমঝোতা স্মারক পুনরায় কার্যকর করতে আর আগ্রহী নন ট্রাম্প। কাতার ও পাকিস্তান নতুন করে আলোচনার চেষ্টা করলেও ট্রাম্প তাদের জানিয়েছেন, আগের শর্তে তিনি আর ফিরতে চান না। কারণ, তার মতে, ইরান একাধিকবার শেষ মুহূর্তে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
তবে এই কৌশল সফল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকের মতে, যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমতের বিরূপ অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে সাবেক মোসাদ প্রধান ডেভিড বারনিয়া ট্রাম্পের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার পথে ‘আরেকটি ধাপ’ মাত্র। কেবল নিষেধাজ্ঞাই যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও গোপন অভিযানের চাপ আরও বাড়াতে হবে।
বারনিয়ার ভাষায়, ‘ইরানের জনগণ বর্তমান শাসনের পতন চায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বও এখন সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।’
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ইরান। দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে ওই জলপথ ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবরোধ দেশটির জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট সৃষ্টি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার তেহরানে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, উত্তেজনা কমানো এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বৈঠক শেষে আল থানি বলেন, ‘সংলাপ ও কূটনীতিই সংকট সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর পথ।’ তিনি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।
ওদিকে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তির আলোচনা চলছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত এবং তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল না করা পর্যন্ত হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
মার্কিন অবরোধের কারণে পর্যাপ্ত পেট্রোল আমদানি করতে না পারার কথাও স্বীকার করেছেন ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাফর গায়েমপানাহ। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা তাদের নীতিগত অবস্থান বদলাতে পারবে না। ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ‘দেশটি এখন পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও আমরা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম হব।’
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল