‘ধন্যবাদ প্রিয় বাবা’, নরওয়ের নতুন রাজার আবেগঘন ভাষণ

৩০ আগস্ট, ২০২৬

প্রয়াত পিতা পঞ্চম হারাল্ডের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও আবেগঘন বার্তা জানিয়ে নরওয়ের নতুন রাজা হিসেবে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন অষ্টম হাকোন। রয়্যাল প্যালেসের একটি ডেস্কে বসে ধারণ করা এই বিশেষ টেলিভিশন বার্তায় তিনি তার প্রয়াত বাবার ছবির পাশে দুটি প্রজ্বলিত মোমবাতি এবং একতোড়া সাদা গোলাপ রেখে কথা বলেন। 

দেশবাসীর উদ্দেশে গভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে নতুন রাজা বলেন, ‘এত ভালো একজন বাবা হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ দীর্ঘ ৩৫ বছর নরওয়ে শাসন করা এবং প্রগতিশীল ও গণমানুষের রাজা হিসেবে পরিচিত ৮৯ বছর বয়সী রাজা হারাল্ড একটি বিরল রক্তের রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৮৯ বছর বয়সে বাবার প্রয়াণের পর রাজদণ্ড হাতে নেওয়া ৫৩ বছর বয়সী অষ্টম হাকোন বলেন, ‘এখন আমার পালা।’ সামনে একটি বড় দায়িত্ব অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে তিনি আগামী দিনগুলোতে জনগণের কাছে উপস্থিত থাকার এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি মনোযোগী থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

ভাষণে হাকোন জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, তার পরিবার আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত এমন এক সমাজে বিশ্বাস করে যেখানে প্রতিটি মানুষের মূল্য সমান। তিনি স্মরণ করেন যে, তার বাবা তার এবং বোন রাজকুমারী মার্থা লুইসের জন্য একজন আদর্শ পিতা, ছয় নাতি-নাতনির জন্য একজন উষ্ণ ও রসিক পিতামহ এবং তার বিধবা স্ত্রী রানি সোনিয়ার জন্য একজন অত্যন্ত স্নেহশীল ও যত্নশীল স্বামী ছিলেন। শনিবার তাদের ৫৮তম বিবাহবার্ষিকী হতে পারত—এ কথা উল্লেখ করার সময় আবেগ ধরে রাখতে না পেরে তার চোখ জলে ভরে ওঠে। 

হাকোন বলেন, হারাল্ড এক স্বাভাবিক নেতৃত্বের ক্ষমতায় পুরো পরিবারকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছিলেন, যা হয়তো তিনি নিজেও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি। তিনি সারাজীবন নিজের মূল্যবোধ এবং দায়বদ্ধতার প্রতি অনুগত ছিলেন এবং পরিবারকে সব সময় মনে করিয়ে দিতেন যেন প্রত্যেকে নিজের মতো করে কাজ করে, নিজস্ব শৈলী খুঁজে নেয় এবং নিজের সত্তাকে বজায় রাখে।

রাজধানী অসলোর রাজপ্রাসাদের সামনে হাজার হাজার নরওয়েবাসী যেভাবে ফুল, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও মোমবাতি নিয়ে সমবেত হয়েছেন, তাকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী অনুভূতি হিসেবে বর্ণনা করেন নতুন রাজা। তিনি বলেন, পরিবার এখন গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এত মানুষ যে তাদের সঙ্গে এই শোকে শামিল হয়েছেন, তা তাদের মনে শক্তি ও সান্ত্বনা জোগাচ্ছে। 

রাজা হারাল্ডের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর থেকেই প্রাসাদের সামনে সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। দেশে জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, যদিও শেষকৃত্যের তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। 

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোয়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে ফুল অর্পণ করেন এবং নতুন রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নরওয়ে আজ গভীর শোক ও কৃতজ্ঞতায় ঐক্যবদ্ধ। নতুন রাজা হাকোন আগামী মঙ্গলবার সংসদে আনুগত্যের শপথ নেবেন এবং পরবর্তীতে তার স্ত্রী রানি মেতে-মারিতের সঙ্গে একটি উৎসর্গ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন, যা নরওয়েতে ঐতিহ্যবাহী মুকুট পরানোর একটি সরলীকৃত রূপ।

তবে নরওয়ের রাজপরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও সংবেদনশীল একসময়ে হাকোন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে রাজপরিবার বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতা এবং একের পর এক বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে। রানি মেতে-মারিত দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী প্রয়াত জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘ তিন বছর বন্ধুত্ব রাখার কথা স্বীকার করার পর সর্বসমক্ষে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ২০১৮ সাল থেকে পালমোনারি ফাইব্রোসিসে ভোগার পর তার ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয় এবং চিকিৎসকরা আগামী বছরের আগে তার অবস্থা পুরোপুরি স্থিতিশীল ঘোষণা করবেন না। ফলে নতুন রাজকীয় কর্তব্যের পাশাপাশি স্ত্রীর শারীরিক দেখভালের দায়িত্বও হাকোনকে সামলাতে হবে। এ ছাড়া, মেতে-মারিতের আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়াস বর্গ হইবি গত জুনে ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, যা বর্তমানে আপিলাধীন রয়েছে। হইবি রাজপরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক সদস্য না হলেও হাকোন ও মেতে-মারিতের বিয়ের পর চার বছর বয়স থেকেই তিনি রাজপরিবারে বেড়ে উঠেছেন। 

অন্যদিকে, হাকোনের বোন মার্থা লুইস ২০২৪ সালে এক আমেরিকান স্বঘোষিত ও বিতর্কিত ঝাড়ফুঁককারীকে বিয়ে করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

ভাষণে এসব বিতর্কের সরাসরি কোনো উল্লেখ না করলেও হাকোন অত্যন্ত কৌশলে বলেন, কঠিন সময়েও নিজেদের ভেতরে এবং একে অপরের জন্য শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কতটা জরুরি, তা তাদের পরিবার হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে। তিনি, তার স্ত্রী মেতে-মারিত এবং ক্রাউন প্রিন্সেস ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা সব সময় সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আরও বলেন, এই দেশে বসবাসকারী কেউ জানে না যে ভবিষ্যতে আমাদের একসঙ্গে কিসের মুখোমুখি হতে হবে, তবে তারা এটা নিশ্চিতভাবে জানেন যে ভালো এবং খারাপ উভয় দিনেই সবাই একে অপরের পাশে থাকবেন। 

রাজা হারাল্ড জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় থাকলেও, চলতি বছর প্রকাশিত পত্রিকা ‘আফতেনপোস্টেন’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে রাজতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন ২০২৪ সালের ৭২ শতাংশ থেকে কমে ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবু নরওয়ের রাজপরিবার বিশেষজ্ঞরা বার্তা সংস্থা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিতর্ক থাকলেও নতুন রাজা অত্যন্ত সম্মানিত ও পরিশ্রমী, এবং এই ধাক্কা সামলে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তার রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি