০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল এখন শুধু উদ্ধার, ত্রাণ কিংবা পুনর্বাসনের অর্থ চাইছে না। দেশটির দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। আর সেই দাবির কেন্দ্রে রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের বক্তব্যে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে নেপালের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। ফলে দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সহায়তাকে শুধু দান বা অনুদান হিসেবে না দেখে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের বিষয় হিসেবে দেখাতে চায় কাঠমান্ডু।
কেন ক্ষতিপূরণ চাইছে নেপাল
নেপালের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলছে। এর ফলে পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় যে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে, সেটিকে সাধারণ বন্যা হিসেবে দেখছেন না খানাল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে পানির স্রোতের উচ্চতা ২০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং স্রোতের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। নুয়াকোট, রাসুয়া ও ঢাড়িং অঞ্চলের অন্তত ১০টি পৌরসভার ৩০ থেকে ৩২টি ওয়ার্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বরফশীতল পানি, পাথর ও পাহাড় ধসের ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে ভয়াবহ স্রোত নেমে আসায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে নেপালের কাছে প্রশ্নটি এখন শুধু একটি দুর্যোগ মোকাবিলার নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষতির দায় কে নেবে, সেটিও।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নাম কেন
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বের বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়ের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিশ্বের শীর্ষ তিন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। অন্যদিকে নেপালের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কার্যত নগণ্য।
এই বৈপরীত্য থেকেই নেপালের ক্ষতিপূরণ দাবির যুক্তি তৈরি হয়েছে। খানালের ভাষায়, নেপাল এমন একটি বৈশ্বিক সংকটের চূড়ান্ত মূল্য দিচ্ছে, যে সংকট তারা তৈরি করেনি।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বের বড় ও ধনী দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হলেও নেপালের ভূমিকা অত্যন্ত সামান্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নেপালকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
নেপাল কি সরাসরি তাদের কাছ থেকে টাকা পাবে
এখানেই নেপালের দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। নেপাল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কথা বললেও দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তিন দেশকে সরাসরি অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়েছে বা এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন তথ্য নেই।
নেপাল বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলতে চাইছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কূটনৈতিক কাঠামোতে সহায়তার পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অর্থাৎ কাঠমান্ডুর অবস্থান হলো, দুর্যোগের পর অর্থ সহায়তা শুধু দয়া বা দানের বিষয় হওয়া উচিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নেপাল এটিকে ন্যায়বিচার এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে।
নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে নেপালের আবেদন
নেপাল শুধু বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি তোলেনি। দেশটি লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের কাছেও জরুরি অর্থ সহায়তা চেয়েছে।
ভোতেকোশি নদী অববাহিকার ভয়াবহ বন্যার পর নেপাল এই তহবিলের বোর্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে এবং বন ও কৃষিমন্ত্রী গীতা চৌধুরী যৌথভাবে চিঠিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্যায় প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, ঘরবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অর্থনৈতিক ও অনর্থনৈতিক ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ব্যাপক এবং তা নেপালের তাৎক্ষণিক সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
তাই নেপাল নির্ধারিত সময়ের পরবর্তী বৈঠকের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহায়তার জন্য লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড গঠিত হয়। ২০২২ সালে কপ২৭ সম্মেলনে এর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০২৩ সালে কপ২৮ সম্মেলনে এটি কার্যকর করা হয়।
নেপাল নিজেকে স্বল্পোন্নত এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা একটি পার্বত্য দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির বক্তব্য, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তাদের অবদান সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
নেপালের আবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের উচ্চভূমিতে তৈরি হওয়া চরম আবহাওয়ার ঘটনা দ্রুত নিচের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব পানি, খাদ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তার ওপর পড়ছে।
শুধু নেপালের লড়াই নয়
শিশির খানালের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট। নেপাল তার দাবি শুধু নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না।
তিনি বলেছেন, হিমালয়ের হিমবাহগুলো যদি হারিয়ে যায়, তাহলে গঙ্গা ও ত্রিশূলির মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের পানির নিরাপত্তা সরাসরি হুমকিতে পড়বে।
এ কারণে নেপাল বলছে, তাদের দাবি শুধু নেপালের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এরই মধ্যে দুর্যোগের এক সপ্তাহ পর নেপাল অংশে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২০০ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯১৬ জন। তিব্বত অংশে নিহত হয়েছেন ১৬ জন এবং নিখোঁজ অন্তত ৫৪৬ জন। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১ হাজার ১৩০ এবং নিখোঁজ ৪ হাজার ৪৬২ জন।
স্বজনদের অপেক্ষাও শেষ হয়নি। নিখোঁজদের কেউ কেউ জীবিত থাকতে পারেন বলে এখনো আশা করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। তবে অনেক পরিবার ইতিমধ্যে নিখোঁজ স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য করেছে।
তামাং সম্প্রদায়ের দোলমা নেওয়া এমনই এক প্রতীকী শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে বলেছেন, তার আত্মার মুক্তির জন্য তাদের এটি করতে হয়েছে। তিনি যেখানে থাকুন, শান্তিতে ও আনন্দে থাকুন।
এদিকে নেপাল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি আরও জোরালো করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির অবস্থান স্পষ্ট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা নয়, তারা ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি সামনে রাখতে চায়।
সূত্রঃ দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট, এনডিটিভি, পিটিআই, দ্য টেলিগ্রাফ