০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তীব্র জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় চাপে রয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দেশের বেশির ভাগ পোশাক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা।
একই সঙ্গে গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
গতকাল বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব তথ্য তুলে ধরে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সংকট, রপ্তানি পরিস্থিতি, বিনিয়োগ এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়।
বিজিএমইএ নেতারা বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১.৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও রপ্তানি কমেছে ১.৯২ শতাংশ। অন্যদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএ নেতারা রাষ্ট্রপতিকে জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক খাতের সংকট কাটিয়ে শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাষ্ট্রপতির কাছে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন বিজিএমইএ নেতারা।
গ্যাসসংকট মোকাবেলায় দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
অবকাঠামো ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর দাবি জানানো হয়। ব্যাংকিং খাতে চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো, পোশাক খাতের জন্য বিশেষ ‘পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং’ ব্যবস্থা চালু এবং জিটিএফ ও টিডিএফ তহবিলে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে বিজিএমইএ।
ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া সহজ ও প্রাতিষ্ঠানিক করার পাশাপাশি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল দ্রুত আমদানির স্বার্থে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বাজার ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ করার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়। এ ছাড়া গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল ও কল্যাণকেন্দ্র নির্মাণে দ্রুত জমি বরাদ্দ এবং ঝুট ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে। বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য সহানুভূতির সঙ্গে শোনেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তৈরি পোশাক শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।’ শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দ্রুত দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা, বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় পোশাক কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন, নন-বন্ডেড কারখানায় বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার মতো সরকারি উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
এই সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, সহসভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরীসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা।